আগস্ট ১৯৪৭: জকিগঞ্জ-করিমগঞ্জের বিচ্ছেদের স্মৃতি

1717

মিফতাহুল ইসলাম তালহা:

ভারতবর্ষের স্বাধীনতার প্রাক্কালে সিদ্ধান্ত হলো দেশভাগ হবে ধর্মের ভিত্তিতে, দ্বিজাতিতত্ত্ব অনুসারে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশসমূহ হবে পাকস্তানের অংশ, আর হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশসমূহ হবে ভারতের অংশ। বাংলা আর পাঞ্জাবের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত একটু ভিন্ন। একই প্রদেশের মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চল পাকিস্তানে যাবে, আর হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল যাবে ভারতে। সে সূত্র অনুসারে পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের আর পশ্চিম বাংলা হলো ভারতের অংশ। প্রতিবেশী আসাম হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়াতে স্বভাবতই ভারতের অংশ হলো। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল সিলেট নিয়ে। সিলেট আসলে পূর্ব বাংলার অংশ, নাকি আসামের? ইতিহাসের নানা যুগপরিক্রমায় সমৃদ্ধশালী এই জেলাটিকে কখনো বাংলার অংশ বানানো হয়েছে, কখনও বা আসামের। এ নিয়ে আক্ষেপ করে রবি ঠাকুর লিখেছিলেন:

“মমতাবিহীন কালস্রোতে
বাঙলার রাষ্ট্রসীমা হোতে
নির্বাসিতা তুমি সুন্দরী শ্রীভূমি।”

যাই হোক, সিলেট আসামের অংশ হলে এই জেলাটি পাচ্ছে ভারত, আর পূর্ব বাংলার অংশ হলে এই জেলাটি পাচ্ছে পাকিস্তান। যেহেতু এই জেলার উপর দুই প্রদেশের দাবি, তাই সিদ্ধান্ত হলো গণভোটের মাধ্যমেই সিলেটবাসী সিদ্ধান্ত নিবে যে তারা পাকিস্তানে যোগ দিবে, না ভারতে? লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনের এই সিদ্ধান্ত অনুসারে সাতচল্লিশের ছয় ও সাত জুলাই গণভোট হলো, তার আগে উভয়পক্ষ আদাজল খেয়ে নামলেন প্রচারণায়। পাকিস্তানের পক্ষে প্রচারণায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি, মাওলানা আকরম খাঁ, মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগিশ প্রমূখ জাতীয় নেতা সিলেটে এসেছিলেন। সে সময়ের তুখোড় জনপ্রিয় ছাত্র নেতা (পরবর্তীতে) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তো জকিগঞ্জেও এসেছিলেন, এবং কংগ্রেসিদের আক্রমণের শিকারও হয়েছিলেন।

যাই হোক, গণভোট হলো, সিলেটবাসী সিদ্ধান্ত ঘোষণা করল তারা পাকিস্তানে যোগ দিবে, পুরো সিলেটের মতোই জকিগঞ্জ-করিমগঞ্জবাসীও নতুন দেশ প্রাপ্তির উৎসবে মত্ত, আনন্দ মিছিলের পর আনন্দ মিছিল করছে। পুরো সিলেট যদি পাকিস্তানে যোগ দেয়, তবে করিমগঞ্জ তো সিলেটের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পাকিস্তানেই থাকবে, এ কথা সুনিশ্চিত। কিন্তু তাদের চোখের আড়ালে তখন চলছিল অন্য খেলা। ভারতবর্ষকে দুই টুকরো করার জন্যে সুদূর বিলেত থেকে উড়ে আসা উকিল রেডক্লিফ সাহেব তাঁর দলবল নিয়ে হিসেব কষছিলেন কোন দিক দিয়ে লাইন টানবেন দেশ ভাগের জন্য। সে হিসেবে মার খেলো জকিগঞ্জ-করিমগঞ্জবাসী, তথা সিলেটবাসী। সিলেটের অবিচ্ছেদ্য অংশ করিমগঞ্জসহ সাড়ে তিন থানা ভোটের মাধ্যমে পাকিস্তানে যোগ দেওয়া সত্ত্বেও তিনি এই এলাকা ভারতের অংশ করে দিলেন। ফলে করিমগঞ্জের অর্ধেক চলে গেল ভারতে, আর অর্ধেক (জকিগঞ্জ অংশ) থাকল পাকিস্তানে। সিলেটবাসীর হাজারো আত্মীয়তা কাটাতারের ওপর পাড়ে চলে গেল, সুরমা-কুশিয়ারা হয়ে পড়ল আন্তর্জাতিক সীমারেখা।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকে জানা যায়, ১৯৪৭ এর আগস্টের চৌদ্দ তারিখ ছিল পবিত্র রমাদান মাসের সাতাশতম রাত, যা লাইলাতুল কদরের রাত হিসেবে উদযাপন করেন সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানরা। সে রাতে ১১:৫৯ মিনিটে গণভোটে রায় প্রকাশ হলে জানা যায়, সিলেটিরা পাকিস্তানে যোগ দিতে যাচ্ছে। এই ঘোষণায় স্থানীয় জনগণ উল্লসিত হয়ে সেই মহিমান্বিত রজনীতে শুকরিয়াস্বরূপ নামাযও আদায় করেন। করিমণঞ্জে উড়তে থাকে পাকিস্তানের পতাকা। এরপর সতেরই আগস্ট প্রকাশিত হয় রেডক্লিফ রোয়েদাদের সিদ্ধান্ত, যা কি না বিচ্ছিন্ন করে ফেলে প্রিয় সিলেটকে, জকিগঞ্জ আর করিমগঞ্জকে বানিয়ে ফেলে দুটো রাষ্ট্রের অংশ। আশাহত হয় সমগ্র সিলেটের মানুষ।

১৯৪৭ থেকে ২০১৭, এই সময়ের মধ্যে কালসমুদ্রে হারিয়ে গিয়েছে সাত সাতটি দশক, সুরমা-কুশিয়ারায় প্রবাহিত হয়েছে অজস্র জলরাশি। কিন্ত সিলেটবাসী কি ভুলতে পেরেছে তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া সে বিচ্ছেদ বেদনা? সত্তুর বছর পরের এই আগস্ট মাসে আবারও এ প্রশ্নটি সবার সামনে চলে আসে, আসলেই কি এই বিচ্ছেদের আর কোন সমাধান ছিল না? এটিই কি সিলেটবাসীর নিয়তি যে শত বছরের সম্পর্ক ভুলে যেতে হবে সাত সমুদ্র-তের নদীর ওপার থেকে আসা এক উকিলের কলমের জোরে? সে সময়ের মুসলিম লীগ নেতাদের কাছে বিষয়টা এতোই তুচ্ছ ছিল যে, তাঁরা এ নিয়ে কোন কথাই বলেন নি। বিন্দু মাত্র প্রচেষ্টা চালান নি সিলেটিদেরকে এই অন্যায্য বিচ্ছেদ থেকে রক্ষা করতে। অন্যথায় এ অঞ্চলের ইতিহাস হয়তো অন্যভাবে লেখা হতো, সিলেটবাসী তাদের অতীত ঐতিহ্য নিয়ে আগের মতোই থাকতে পারত।

কে এই রেডক্লিফ?
সিরিল রেডক্লিফ। ব্রিটিশ আইনজীবী। চল্লিশ কোটি (সে সময়ে) মানুষের মাতৃভূমি ভারতবর্ষ কেটে দুই টুকরো করার দায়িত্ব পেয়ে সুদূর বিলেত থেকে উড়ে আসেন এই ভদ্রলোক। এই কাজের জন্যে সময় পান মাত্র পাঁচ সপ্তাহ। নানা সীমাবদ্ধতা আর রাজনৈতিক কূটচালে তিনি এক বিস্ময়কর বিভাজন রেখা তৈরি করেন, যেটির অন্যায্যতা সম্পর্কে তিনি নিজেও সচেতন ছিলেন। আর তাই ভারত ত্যাগের পূর্বে নিজের কাজের সকল দলিল-দস্তাবেজ পুড়িয়ে নষ্ট করে যান তিনি। সরকার তাঁকে ‘নাইট গ্র্যান্ড ক্রস অব দ্য অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার’ পুরস্কার দিলেও তাঁর সম্পর্কে পাঞ্জাবি ও বাঙালিদের মনোভাব সম্পর্কে রেডক্লিফের মনে কোনো সন্দেহ ছিল না। তিনি বলেন, ‘আট কোটি মানুষ চরম দুঃখ-দুর্দশা ও অভিযোগ নিয়ে আমাকে খুঁজবে। আমি চাই না তাদের সঙ্গে আমার দেখা হোক।’ সিরিল রেডক্লিফ কখনোই ভারত বা পাকিস্তানে ফিরে আসেন নি, আসেন নি এই বঙ্গভূমে। তবে দশকের পর দশক গালি খেয়ে যাচ্ছেন এই জনপদের অধিবাসীদের, সেটা যে তিনি নিজেও বুঝতে পেরেছিলেন, তা তো তাঁর কথা থেকেই স্পষ্ট বুঝা যায়।

তথ্যসূত্র:
* প্রসঙ্গ জকিগঞ্জ: ইতিহাস ও ঐতিহ্য, হান্নান মিয়া সম্পা.
* জকিগঞ্জের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, মোহাম্মদ তাবারক হুসাইন
* বিবিসি বাংলা