সহনীয় মাত্রা

206

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, ঘুষের সহনীয় মাত্রা কত?

সম্প্রতি এ ধরনের ফেসবুক স্ট্যাটাস বেশ লক্ষ্যণীয়। মন্ত্রী মহোদয় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সহনীয় মাত্রার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর শুরুর দিকে ডিআইএ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগে নিয়ে আসতেন শিক্ষকরা। তারা বলতেন, সহনীয় মাত্রায় ঘুষ নিলে তারা চলতে পারবেন। এই উদাহরণই তিনি দিয়েছেন সেদিন।

‘অনেক শিক্ষক এসে আমার কাছে কান্নাকাটি করে বলতেন, আমরা নিম্ন বেতনে চাকরি করি, এত টাকা আমরা কোথা থেকে দেবো। এক মাসের বেতন সম্পূর্ণ টাকা ঘুষ দিলে পরিবার পরিজন নিয়ে আমরা খাব কী করে? ঘুষের মাত্রা আরেকটু সহনীয় হলেও বাঁচতাম বলে তারা মন্তব্য করতেন। এটা শিক্ষকদের কথা।’ সূত্র: চ্যানেল আই অনলাইন

প্রথমে জেনে নিই সহনীয় মাত্রা কী?
১.তখন ১৯৯৮ সাল। বড় মামার বিয়েতে নানাবাড়ি গিয়েছি। তখন স্প্রে দিয়ে ঢং-তামাশার বালাই ছিল না। গোবর মিশ্রিত পানি ছিল উৎকৃষ্ট উপাদান। আমার ছোট খালু ছিলেন ছিলেন মামাদের নতুন দুলাভাই। তাই গোবরে অংশটি তার জন্য ছিল বেশি । মামারা একটি বালতিতে গোবর ঘুলিয়ে খালুকে ছিটাতে লাগলেন। গোবরের বাটি নিয়ে মামা যখন দৌড়ান দিচ্ছেলেন ছোট খালু প্রাণভয়ে সামনে এগুচ্ছেন। প্রাণ বাঁচাতে তিনি ঢুকে পড়েন পর্দাবৃত অস্থায়ী রন্ধনশালায়। তাতেও তার রেহাই মেলেনি। সেখানে তিনি গোবরস্নাত হন।
গোশতের ডেগগুলি ঢাকা ছিল। হয়তো কোন একটির বাইরের অংশে হালকা গোবরের ছিটা পড়েছিল। তবে এটা নিশ্চিত ডেগের ভিতরে বিন্দুমাত্র পৌঁছেনি।
যারা দেখেছেন তারা হয়তো এই ডেগ ছাড়া বাকি ডেগের তরকারি খেয়েছেন। কিন্তু যারা দেখেননি কেবল শুনেছেন তাদের জন্য খুরমা পোলাও বাদ দিয়ে রান্নাঘরে বেগুন ভাজি ও আলুভর্তা তৈরি করতে হয়েছিল। এটা ছিলো সেদিনের সহনীয় মাত্রা।

২. মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর স্বীকৃতি বঙ্গবাসীর জন্য এক অনুপম দৃষ্টান্ত। তিনি যখন বলেছিলেন, মন্ত্রীরা চোর, আমিও চোর। পরক্ষণে যদি বলতেন, আপনারা কি কেউ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন, আমরা ঘুষ খাই না। ভাগ্যিস বলেননি। নইলে ঘুষ খাননি এমন শিক্ষা কর্মকর্তার সংখ্যা খুব কমই হতো।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে এক চোরের খনি অনুভব করেছিলেন। কিন্তু সে খনি হতে তিনি মুক্তা উত্তোলন করতে পারেননি। তার আগেই তিনি ইতিহাসের নির্মম সত্যতার মুখোমুখি হন।
টানা পাঁচবার দুর্নীনিতে শিরোপা জেতার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সে খনি হতে কিছু মুক্তা আহোরণ করেছিলেন। কিছু রত্ন দেশের ভিতরে রেখেছেন এবং কিছুটা চড়া দামে বিদেশে চালান করেছেন আর কিছুটা হাওয়া ভবনের মতো হাওয়ায় মিলিত হয়ে যায়। কয়লার খনি হতে কয়লা উত্তোলনের পর যখন তা পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয় তখন তা একেবারে কয়লাশূন্য হয়ে যায়, তা নয়। কয়লার কিছু অংশ বাকি থাকে। তাই বাংলাদেশের সে মুক্তাগুলো বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে।

৩. সুদ- ঘুষ বাংলাদেশের দুটি প্রতিষ্ঠিত রীতি। সুদ ছাড়া ব্যাংক পরিচালনা সম্ভবপর নয়। সাধারণ ব্যাংকে যাকে বলা হয় সুদ । কমার্শিয়াল ব্যাংকে তা মুনাফা। ইসলামী ব্যাংকে তা মুদারাবা।
মৌলিকভাবে গোবর নাপাক ও হারাম। এখন চারজন গোবর খেকো মানুষকে কল্পনা করি। যারা রোগমুক্তির জন্য ফুটপাথের কোন কবিরাজের পরামর্শে নিয়মিত গোবর খান। একজন গোবরকে বলেন ‘ময়লা, দ্বিতীয়জন ‘নাজাসত’, তৃতীয়জন ‘ডাস্ট’ এবং চতুর্থজন বলেন ‘সুইটস’।
আমরা কি বরতে পারবো এই ‘সুইটস’ খাওয়া শরিয়তে হালাল। আসলে বস্তুর নাম মূখ্য নয়। বস্তুটি কী সেটিই মূখ্য। ইসলামী ব্যাংকের মুদারাবা সেই সুইটসের অনুরূপ।
তেমনিভাবে ঘুষ কোন অফিসে ‘চা-পানের পয়সা’, কোথাও বখশিস, টিপস, মোবাইল বিল, স্যারের সম্মানী ইত্যাদি নামে পরিচিত। অফিসের কর্মকর্তার কাছে সে ফাইলটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ যেটিতে টিপসের পরিমাণ বেশি। অফিসের কাজের জন্য মাস শেষে তারা যে মাইনে পান তা তাদের কাছে গৌণ।

৪. বর্তমান সভ্য সমাজে সুদ-ঘুষ যেমন প্রতিষ্ঠিত রেওয়াজ। আইয়ামে জাহেলিয়াত অর্থ্যাৎ অন্ধকার যুগে মদ্যপান অনুরূপ প্রচলিত  ছিল। ইসলামের প্রাথমিক যুগে সাহাবায়ে কেরাম রা. মদ্যপান করতেন।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন একদিনে এক আয়াত নাযিলের মাধ্যমে মদ্যপানকে হারাম করেননি। প্রথমে নাযিল হয় – ‘হে মোমিনরা! তোমরা (মদ পান করে) নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের নিকটবর্তী হয়ো না।’ (সূরা নিসা : ৪৩)।
তখন অধিকাংশ সাহাবী বুঝতে পারেন মদ্যপান ভালো কাজ নয়। তারা মদ্যপান ছেড়ে দেন।
কিছুদিন পর আবার আয়াত নাযিল হয়- ‘হে মোমিনরা, নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা-দেবী ও ভাগ্যনির্ধারক তীরগুলো নাপাক শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা তা পরিহার করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।’ (সূরা মায়েদা : ৯০)।
তখন সকল সাহাবী মদ্যপান ছেড়ে দেন। স্থায়ীভাবে ইসলামে মদ হারাম হয়। এটি ছিল মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিশেষ কৌশল।

বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী হয়তো এ আয়াতের অনুসরণ করে সহনীয় মাত্রার কথা বলেছেন। যখন দেশে ঘুষ গ্রহণের পরিমাণ সহনীয় মাত্রায় চলে আসবে তখন তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে ঘুষ বন্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বা প্রচলিত ঘুষ আদান-প্রদানের আইনকে আরো শক্তিশালী ও কার্যকরী করবেন এই প্রত্যাশা।

লিখেছেন- নন্দিত দিন্দু