মাতৃভাষায় পরিভাষা বিড়ম্বনা: মোহাম্মদ কামরুজ্জামান

239

জকিগঞ্জ ভিউ:: রবিবার সন্ধ্যায় সংসদ অধিবেশন দেখছি। প্রশ্নোত্তর পর্ব চলছে। “সমাজকল্যাণ মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ বলেন, চলতি অর্ধ -বছরে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন নিবন্ধিত এতিমখানায় capitation Grant বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। প্রত্যুত্তরে নওগাঁ-২ আসনের এমপি শহীদুজ্জামান সরকার বলেন- মাননীয় স্পিকার স্যার, এটা ফেব্রুয়ারি মাস, ভাষার মাস। রাষ্ট্রভাষা বাংলাকে সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠা করা সাংবিধানিক দায়িত্বও বটে। মাননীয় মন্ত্রী capitation grant এধরনের ইংরেজি শব্দ ব্যবহার হতে কবে থেকে বিরত থাকবেন, আমি আপানার মাধ্যমে জানতে চাচ্ছি।
মন্ত্রী উত্তরে বলেন, আমি ভাষা শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। ক্যাপিটেশন গ্রান্ট ইংরেজি শব্দ হলেও বহুল প্রচলিত। অনেক সময় আমরা বিদ্যালয় না বলে স্কুল বলি, মহাবিদ্যালয় না বলে কলেজ বলি। এটা সহজ মনে হয়। তবে আমি মাননীয় সংসদ সদস্যকে বলতে চাই, এটা হবে, সময় বলে দেবে।” (১৭-০২-১৯ জাতীয় সংসদ অধিবেশন)
কথা হচ্ছে দিন দিন কী প্রচলিত বিদেশি শব্দের বাংলা পরিভাষা ব্যবহৃত হবে? না সরাসরি বিদেশি শব্দের ব্যবহার বহুলভাবে বৃদ্ধি পাবে।
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ভেবে দেখি পরিভাষা কখন সৃষ্টি করা উচিত। ধরি, সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত আধুনিক যন্ত্র হচ্ছে মোবাইল ফোন। যা সব সময় হাতের কাছে রাখি। দৈনিক শত কোটিবার বাঙালিরা শব্দটি উচ্চারণ করেন। মোবাইল ফোন বিদেশি শব্দ। কবি নির্মলেন্দু গুণ একে মুঠোফোন বলেছেন। কিছু সংবাদমাধ্যমে মুঠোফোন শব্দটির ব্যবহার দেখা যায়। আমরা যদি সাধারণ মানুষের কাছে মুঠোফোনের খোঁজ করি, তবে হাতে রেখেও বলবেন, আমি কখনও মুঠোফোন দেখিনি।

এর কারণ কী? কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মোবাইল ফোন পৌঁছার পর মুঠোফোন শব্দের অাবিষ্কার হয়েছে। এখন মুঠোফোন বলার অভ্যাস তৈরি করতে পুরস্কার ঘোষণা করলেও কাজ হবে বলে মনে হয় না।
বৃটিশদের আগমনের পূর্বে বঙ্গদেশে চেয়ার-টেবিল, শার্ট-প্যান্ট এসবের বালাই ছিল না। আমরা জলচৌকি, ধুতি, চাদর এসব ব্যবহার করতাম। ইংরেজ বণিকরা নিজেরাই এসব আসবাবপত্র ব্যবহার করে বিজ্ঞাপনের কাজ সারতো। তারা যে নাম বলে জিনিশটি বিক্রি করতো বাঙালিদের কাছে এটি সে নামেই পরিচিত হতো। এধরনের বিদেশি শব্দকে বাংলা অভিধানে স্থান দেওয়া হয়েছে। যদিও ব্যুৎপত্তিগতভাবে এসব বিদেশি শব্দ।
কোন বিদেশি শব্দ দেশে প্রচলিত হওয়ার পর বা কোন বস্তু দেশের বাজারে আমদানি হবার পর তার পরিভাষা সৃষ্টি করা বিড়ম্বনা ছাড়া কিছু নয়।

বাংলাদেশ ছাড়া ভারতেও বাংলাভাষী মানুষ আছেন তবুও বারবার দেশ উল্লেখ করছি। কারণ ঢাকা ও কলকাতা পরিভাষা ব্যবহারে একই নয়। আবার কিছু শব্দের বানানও সমান নয়। যেমন ভারতীয় পত্রিকায় পৌরসভাকে পুরসভা, টেলিভিশনকে দূরদর্শন, সচিবালয়কে মহাকরণ, পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বিদেশমন্ত্রী লিখতে দেখা যায়।

গত বছরে কলকাতায় ঘটে যাওয়া একটি পরিভাষা বিড়ম্বনার ঘটনা জানা যাক – “কলকাতা পুরসভা ৪১টি অ্যাম্বুল্যান্স, ২৫টি লাইফ সেভিং ক্রিটিক্যাল কেয়ার অ্যাম্বুল্যান্স পুলিস কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অথরিটির হাতে তুলে দিল। এই অ্যাম্বুল্যান্সগুলির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। বুধবার নবান্নে এই অনুষ্ঠানে অ্যাম্বুল্যান্সের গায়ে ‘‌গ্লান যান’‌ লেখায় উষ্মা প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‌সাধারণ মানুষের বোঝার মতো শব্দই এখানে ব্যবহার করা উচিত। এটা কি ব্যবহারিক বাংলা?’‌‌ তড়িঘড়ি অ্যাম্বুল্যান্সগুলির পিছন থেকে গ্লান যান লেখা মুছে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।” (দৈনিক আজকাল ১৪ জুন,২০১৮)

মজার বিষয় হলো উপজেলা নির্বাহী অফিসার পদাধিকারবলে উপজেলা এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রটের দায়িত্ব পালন করেন। ইউএনও পদের নাম করণের সময় মনে হয় সচিবালয়ে কোন ডিকশিনারি ছিল না। অনেক হার্টের রোগী বা তাদের অভিভাবককে দেখেছি যারা কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক, হার্ট স্পেশালিস্ট ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার একই ব্যক্তি কিনা তা জানার জন্য কোন পথচারি শিক্ষিত লোকের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
ছোটবেলায় চেয়ার অর্থ কেদারা, টেবিল অর্থ চারপায়া মুখস্ত করতাম। শার্ট অর্থ জামা মেনে নিলেও প্যান্ট অর্থ পাজামা মানতে পারতাম না। কারণ পাজামা হলো ছয় টুকরো সুতি কাপড়ে সেলাই করা মোটা পায়ের পোশাক; পক্ষান্তরে প্যান্ট হলো শক্ত কাপড়ের তৈরি চেইন ও পকেটওয়ালা পোশাক। এখানেই বিপত্তির শুরু। মা-বাবা, গুরুজনের কাছে কোন সমাধান না পেয়ে প্যান্টের অর্থ দিলাম খ্রিস্টানি পাজামা।

অক্সফোর্ড ডিকশনারি বিশ্বের সর্বাধিক পঠিত ও গ্রহণযোগ্য অভিধান। প্রতিবছর এতে নতুন শব্দ সংযোজন এবং পুরাতন দুর্বোধ্য শব্দ বিয়োজনও করা হয়। তাতে ভাষা আরো সমৃদ্ধ হচ্ছে, মৌলিকত্ব নষ্ট হচ্ছে না। কিন্তু বাংলা একাডেমি বা আভিধালেখক পণ্ডিতগণ বিদেশি শব্দের পরিভাষা সৃষ্টিতে যথেষ্ট কার্পণ্য ও সময় ব্যয় করেন। ফলে শিক্ষিত পেশাজীবীরা কথা বলতে অর্ধেক বাংলা ও অর্ধেক ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে জগাখিচুড়ি তৈরি করেন। যাতে ভাষা মৌলিকত্ব হারায় ও শ্রুতিকটু হয়ে ওঠে। সুতরাং শব্দের ব্যবহার প্রচলিত হবার পূর্বেই পরিভাষা সৃষ্টি প্রয়োজন।

লেখক- শিক্ষার্থী: রাজনীতি অধ্যয়ন বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।