একটি স্বপ্নের অপমৃত্যু: কিছু কথা

217

জকিগঞ্জ ভিউ::

একটি স্বপ্নের অপমৃত্যু: কিছু কথা

মাজহারুল ইসলাম জয়নাল

দূর্ঘটনা-এক্সিডেন্ট যে কাউকেই আঘাত করে, সাধারণ মৃত্যুতে যেখানে ধৈর্য ধারণ করা কঠিন হয়; সেখানে এক্সিডেন্ট বা অপমৃত্যুতে ধৈর্য ধারণ করা সত্যিই অনেক কঠিন।জানি সকল মৃত্যুই মহান আল্লাহর হুকুমেই হয়,মৃত্যুতো মৃত্যু ই।সবাইকেই একদিন মৃত্যুর সাধ গ্রহণ করতে হবে, কেহ আগে কেহ পরে এইতো। তারপরে ও যেন কিছু কিছু মৃত্যু মানবসৃষ্ট! সড়ক দুর্ঘটনায় যারা প্রিয়জনকে হারিয়েছেন তারাই সেই হারানোর বেদনা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন।
দুর্ঘটনা নিয়ে লিখতে ভালো লাগে না। কিছু দুর্ঘটনা না লিখিয়ে পারাও যায় না! যে সড়ক দুর্ঘটনাটি আমাকে আমার পরিবারকে কাঁদিয়েছে অবিরত, আর প্রতিবাদী করে তুলছে ক্রমশ। প্রতিদিন দেশের কোথায় না কোথায় সড়ক এক্সিডেন্টে কত পরিবারকে অসহায় করেছে, পিতা সন্তান হারাচ্ছে, সন্তান পিতা হারাচ্ছে, ভাই বোনকে হারাচ্ছে, স্ত্রী সামী হারাচ্ছে!তার পরিসংখ্যান দিন দিন বেড়েই চলছে । এ যেন সড়ক নয় ঘাতক! এ যেন গাড়ি নয়; মৃত্যুর বাক্স! আগেই আবেগী এই লেখার জন্য ক্ষমা প্রার্থী..

আসি মুল ঘটনায়,গত শনিবার ১৬ ফ্রেবুয়ারী ২০১৯ আমাদের পরিবারের জন্য কলঙ্কিত একটি দিন।আমার প্রিয় ভাতিজি মা মণি, মাহফুজা আনজুম তাসনিম( ২০) সড়ক দুর্ঘটনায় ইন্তেকাল করে, ইন্নালিল্লাহী ওয়া ইন্নাইলাইহি রাজিউন। এক রবিবারে বিয়ে আরেক রবিবারে মৃত্যু,হাতের মেহদীর রঙ মুছে যাওয়ার আগেই প্রাণ কেড়ে নিল ঘাতক বাস।তাসনিম চিরদিনের জন্য চলে গেলো না ফেরার দেশে। একটি সড়ক দুর্ঘটনায় তছনছ হয়ে গেল একটি পরিবারের সকল স্বপ্ন। ভাতিজির স্বপ্ন ছিল সবাইকে নিয়ে গড়ে তুলবে একটি সুখী সমৃদ্ধ পরিবার। কিন্তু স্বপ্ন পূরণ করতে দিল না ঘাতক বাস! স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল।

তাসনীম, আলহাজ্ব মিনা বেগম নুরানীয়া মহিলা দাখিল মাদরাসার সুপার ও ওসমানীনগর উপজেলা জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের সহ সভাপতি মাওলানা আব্দুল কাইয়ুমের( আমার চাচাতো ভাই) প্রথমা কন্যা। আমাদের পরিবারের সকলের বড় ভাতিজি হিসেবে সে তার দাদা – দাদী, চাচা- চাচী,ভাই- বোন,ফুফু, মামা-মামি,সকলের নিকট ই তার প্রতি একটু বেশিই আদর, স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা ছিল।
সিলেটের দক্ষিণ সুরমার মুহাম্মদপুর (মামনপুর) গ্রামের ফ্রান্স প্রবাসী জুবের আহমদের সাথে ভাতিজির বিয়ে হয় গত রোববার ।আমাদের মূল বাড়ি জকিগঞ্জ উপজেলার হাতিডহর গ্রাম। বিয়ের পর স্বামী জুবেরের সঙ্গে তাদের মুহাম্মদপুরস্থ বাড়িতে চলে আসে তাসনিম। এর মধ্যে ফিরাযাত্রায় পিত্রালয়ে একবার ঘুরে এসেছে। স্বামী ফ্রান্সে যাবে। এ কারণে পিতার বাড়ি থাকা হয়নি।

গতকাল ১৬ ফ্রেবুয়ারী বিকেলে সিলেট নগরীতে এক আত্মীয়ের বাসায় দাওয়াত খেতে নিজ বাড়ি মুহাম্মদপুর থেকে সিএনজি অটোরিকশাযোগে বের হন জুবের ও তাসনিম। সঙ্গে ছিলো তাসনিমের ননদ লিয়া বেগম ও আয়শা সিদ্দীকা চাদনী। সিএনজি অটোরিকশাটি বিকেল ৪টার দিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দক্ষিণ সুরমার বদিকোনা পশ্চিমপাড়া মারকাজের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এখানে আসা মাত্র বিপরীত থেকে আসা যাত্রীবাহী বাস তাদের অটোরিকশাকে চাপা দেয়। এতে দুমড়ে-মুচড়ে যায় তাদের বহনকারী অটোরিকশা। দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই দক্ষিণ সুরমা কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্রী লিয়া বেগম মারা যায়। চালক সহ অপর চারজনকে আশংকাজনক অবস্থায় সিলেট ওসমানী হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে আয়শা সিদ্দিকা চাদনী। সে দক্ষিণ সুরমার নুরজাহান কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্রী। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ভাতিজি তাসনিম আক্তার তার মাথা গুরুতর জখমপ্রাপ্ত হয়। তাকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসার পর সঙ্গে সঙ্গে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। সন্ধ্যার দিকে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেয়া হয় নগরীর ওয়েসিস হাসপাতালে। সেখানে নেয়ার পরপরই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে তাসনিম আক্তারও। স্বামী জুবেরও আহত হয় তাকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে আল্লাহর হুকুমে সে নিরাপদ এ আছে।
এমন দুর্ঘটনা কোনোভাবেই মেনে যায় না। বেপরোয়া যানবাহন চালকদের কারণে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে; এসব কি থামবে না?আর কত মায়ের বুক খালি হলে নিরাপদ সড়ক হবে?

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। এর হাত থেকে আমাদের কি নিষ্কৃতি নেই? বেপরোয়া যানবাহন চালকের কাছে জনগণ জিম্মি হয়ে থকেবে?
সম্প্রতি সড়ক দুর্ঘটনার এক ভয়াবহ চিত্র আমরা পেয়েছি যাত্রীকল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনে।

গত ২৫ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৮ সালে সারা দেশে ৫ হাজার ৫১৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭ হাজার ২২১ জন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন প্রায় ১৫ হাজার ৪৬৬ জন। এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ২০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্যানুযায়ী ২০১৭ সালে ৪ হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭ হাজার ৩৯৭ জন; আহত হয়েছেন ১৬ হাজার ১৯৩ জন।
২০১৬ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪ হাজার ৩১২টি; নিহত হয়েছেন ৬ হাজার ৫৫ জন; আহত হয়েছেন ১৫ হাজার ৯১৪ জন। একইভাবে ২০১৫ সালে ৬ হাজার ৫৮১টি দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত হয়েছেন যথাক্রমে ৮ হাজার ৬৪২ এবং ২২ হাজার ৮৫৫ জন।
এ তথ্যানুযায়ী দেখা যায়, প্রতি বছর সড়কে গড়ে ৭ হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। কিন্তু সরকারি হিসাবে এ সংখ্যা ৪ হাজারেরও কম। সমিতির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৭ হাজার ২২১ জনের মধ্যে ৭৮৭ জন নারী ও শিশু ৪৮৭।

প্রতিনিয়ত সব কিছুর মূল্য বাড়ছে, এ অবস্থায় মানুষের জীবনের মূল্য কি ক্রমাগত হ্রাস পাবে দিনদিন ?

প্রতিদিন এত দুর্ঘটনা ঘটছে; এসব প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে? গণপরিবহনে এত নৈরাজ্য কেন? চালকরা এত বেপরোয়া কেন? সকল ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগে গড়িমসি কেন? আমাদের জীবন প্রতি মুহূর্তে হুমকির সম্মুখীন।

ঘরের বাইর বের হলেই আতঙ্কে থাকি নিরাপদে আবার ঘরে ফিরতে পারব কিনা? এ অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে হলে দায়ীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের মতো নতুন করে যাতে আর কারো স্বজন হারানোর বেদনায় দিন কাটাতে না হয়। তার জন্য যা যা করণীয় তা করতে হবে। সড়কে নিরাপত্তার নিশ্চয়তাটুকু পাওয়ার জন্য আমাদের আর কতকাল অপেক্ষা করতে হবে?

আমাদের মতো তিনটি পরিবারের তিনজনকে হারানোর মতো বেদনাময় দুর্ঘটনা যাতে আর কারো জীবনে না ঘটে। ভাতিজির মতো একটি সপ্নের অপমৃত্যু যাতে আর না হয়; ঘাতক সড়ক আর বাসের কারণে । নিরাপদ সড়কের জন্য আমাদের মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সড়ক ও যোগাযোগ পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের সদয় সুদৃষ্টি কামনা করি।
প্রিয় মা মণি তাসনিম, তুমি তুমার প্রিয় দুই ননদকে নিয়ে ভালো থেকো পরকালে। মহান আল্লাহ যেন তুমাদের মৃত্যুকে শাহাদাতের মৃত্যু হিসেবে কবুল করেন,আমিন।
ইতি তুমার জয়নাল চাচ্চু।

লেখক :প্রাবন্ধিক ( তাসনিমের চাচা)
majharul276@gmail.com