অজানা হাসন রাজা- সেলিনা আক্তার

160
জকিগঞ্জ ভিউ:: কেন জানি না হঠাৎ করে একদিন হাসন রাজা সম্পর্কে কিছু পড়তে ইচ্ছে হলো। ঘাঁটাঘাঁটি করে অবশ্য অনেক মূল্যবান তথ্য পেয়েছি, অনেকে হয়তো জানেন, আমি জানি না।আমার যতটুকু জানা, তার উৎস ছোটবেলায় আম্মার কাছ থেকে শোনা। আম্মা কতটুক সঠিক বলেছেন, সেটাও জানার বিষয়। গল্প শুনে আমি তাঁকে গুন্ডাপান্ডাই ভাবতাম, তার ওপর গোঁফের যে বাহার! তবে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে তাঁকে হাসনগীতির গায়ক হিসেবেই জানতাম।বেশি দাগ কেটেছে যৌবনে তাঁর হাওরের নাইওরি নৌকায় হামলা চালানোর ঘটনা। মেয়েদের উঠিয়ে নিয়ে যেতেন। তাঁকে ফেরানোর জন্য তাঁর মা নিজে একদিন নাইওরি নৌকায় অজ্ঞাত নাইওরি সেজে যাত্রা করেছিলেন এবং লজ্জাকর অবস্থায় ফেলে ছেলেকে এই সর্বনাশা পথ থেকে ফিরিয়েছিলেন। কী মনছোঁয়া কথা! পিয়ারি যে ঠিক কে আমি জানি না। তাঁর পত্নী? নাকি প্রেমিকা? নাকি শুধু কল্পনা?হাসন রাজার পূর্বপুরুষেরা হিন্দু ছিলেন। তাঁদেরই একজন বীরেন্দ্রচন্দ্র সিংহদেব মতান্তরে বাবু রায়চৌধুরী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। হাসন রাজার পূর্বপুরুষের আধিবাস ছিল অযোধ্যায়। সিলেটে আসার আগে তাঁরা দক্ষিণবঙ্গের যশোর জেলার অধিবাসী ছিল

বাল্যকাল
সিলেটে তখন আরবি-ফারসির চর্চা খুব প্রবল ছিল। সিলেটে ডেপুটি কমিশনার অফিসের নাজির আবদুল্লা বলে এক বিখ্যাত ফারসি ভাষাভিজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শমতে, তাঁর নামকরণ করা হয় হাসন রাজা। বহু দলিল-দস্তাবেজে হাসন রাজা আরবি অক্ষরে নাম দস্তখত করেছেন হাসান রাজা।হাসন দেখতে সুদর্শন ছিলেন। মাজহারুদ্দীন ভূঁইয়া বলেন, ‘বহু লোকের মধ্যে চোখে পড়ে তেমনি সৌম্যদর্শন ছিলেন। চারি হাত উঁচু দেহ, দীর্ঘভূজ, ধারাল নাসিকা, জ্যোতির্ময় পিঙ্গলা চোখ এবং একমাথা কবিচুল পারসিক সুফিকবিদের একখানা চেহারা চোখের সম্মুখে ভাসত।’
তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত। তিনি সহজ-সরল সুরে আঞ্চলিক ভাষায় প্রায় সহস্রাধিক গান রচনা করেন।
যৌবনকাল
উত্তরাধিকারসূত্রে তিনি বিশাল ভূসম্পত্তির মালিক ছিলেন। প্রথম যৌবনে তিনি ছিলেন ভোগবিলাসী ও শৌখিন। রমণীসম্ভোগে তিনি ছিলেন অক্লান্ত। তাঁর এক গানে নিজেই উল্লেখ করেছেন, ‘সর্বলোকে বলে হাসন রাজা লম্পটিয়া।’ পুকুরঘাটে স্নানরত গ্রামের মেয়েরা; ঘোড়ার পায়ের শব্দ শুনেই একজন বলে উঠল, ‘এই তাড়াতাড়ি পানিতে ডুব দে নতুবা জমিদারবাবু তুলে নিয়ে যাবে।’ এই কথা থেকেই বোঝা যায়, জমিদারবাবু বিশেষ সুবিধার না।
জমিদারবাবু পুকুরঘাটের পাশ দিয়ে আসার সময় গ্রামের আরেক মেয়ের সঙ্গে দেখা হয় এবং তার রূপে মুগ্ধ হয়ে নিজের গলার মালা ছুড়ে দেন আর গেয়ে ওঠেন এই গানটি, ‘সোনা বন্দে আমারে দেওয়ানা বানাইল, দেওয়ানা বানাইল মোরে ফাগল খরিল।’
গান পুরোটা মন দিয়ে শুনলে রূপের মুগ্ধতা আর হাসন রাজার বদনামের খবর পাওয়া যায়। দিলারামকে হাসন রাজা সত্যিই ভালোবাসতেন। দিলারামও সেই সোনার চেইন উপঢৌকন পাওয়ার পর থেকে হাসন রাজাকেই তাঁর সর্বস্ব মানতেন।
দিলারাম বেনামে সাধনসঙ্গিনী, মাঝেমধ্যে তাঁর গানে উপস্থাপিত হয়েছেন:
ধর দিলারাম, ধর দিলারাম, ধর দিলারাম, ধর।
হাসন রাজারে বান্ধিয়া রাখ দিলারাম তোর ঘর।।
কিংবা,
তোমরা শুনছনি গো সই।
হাসন রাজা দিলারামের মাথার কাঁকই।
পরিবারের সম্মানের কথা ভেবে ওনার মা দিলারামকে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য করেন। কিন্তু দিলারাম বলেছিলেন, ‘আমি চলে গেলে অঘটন ঘটে যাবে মা’, এবং এর পরপরই হাসন রাজা বাইজিবাড়ি আর শরাবে ডুবে থাকতেন। নাইওরি নৌকায় হামলা করতেন। মেয়েদের তুলে নিয়ে যেতেন। এটা ঠিক তাঁর মা নাইওরি নৌকায় নিজেকে তাঁর শিকার হিসেবে উপস্থাপন করেন। (যা আমার আম্মার কাছে গল্প শুনেছিলাম) এবং লজ্জা পেয়ে হাসন রাজা এ পথ থেকে ফিরে আসেন এবং হাসন ক্ষমা চেয়ে মায়ের পায়ে লুটিয়ে পড়েন। তবে উনি বাইজি বাড়িতে যেতেন। পিয়ারি ছিলেন লখনৌ থেকে আগত একজন বাইজি। উনিও খুবই সুন্দরী ছিলেন। তাঁর প্রেমেই হাসন গেয়েছিলেন,
“নেশা লাগিল রে বাঁকা দুই নয়নে নেশা লাগিল রে
হাসন রাজা পিয়ারির প্রেমে মজিলোরে।”

পরিবারের সম্মানের কথা ভেবে ওনার মা দিলারামকে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য করেন। কিন্তু দিলারাম বলেছিলেন, ‘আমি চলে গেলে অঘটন ঘটে যাবে মা’, এবং এর পরপরই হাসন রাজা বাইজিবাড়ি আর শরাবে ডুবে থাকতেন। নাইওরি নৌকায় হামলা করতেন। মেয়েদের তুলে নিয়ে যেতেন। এটা ঠিক তাঁর মা নাইওরি নৌকায় নিজেকে তাঁর শিকার হিসেবে উপস্থাপন করেন। (যা আমার আম্মার কাছে গল্প শুনেছিলাম) এবং লজ্জা পেয়ে হাসন রাজা এ পথ থেকে ফিরে আসেন এবং হাসন ক্ষমা চেয়ে মায়ের পায়ে লুটিয়ে পড়েন। তবে উনি বাইজি বাড়িতে যেতেন। পিয়ারি ছিলেন লখনৌ থেকে আগত একজন বাইজি। উনিও খুবই সুন্দরী ছিলেন। তাঁর প্রেমেই হাসন গেয়েছিলেন,
“নেশা লাগিল রে বাঁকা দুই নয়নে নেশা লাগিল রে
হাসন রাজা পিয়ারির প্রেমে মজিলোরে।”
বৈরাগ্যভাব
হাসন রাজা দাপটের সঙ্গে জমিদারি চালাতে লাগলেন। কিন্তু এক আধ্যাত্মিক স্বপ্নদর্শন হাসন রাজার জীবনদর্শন আমূল বদলে দিল। হাসন রাজার মনের দুয়ার খুলে যেতে লাগল। তাঁর চরিত্রে এল এক সৌম্যভাব। বিলাসপ্রিয় জীবন তিনি ছেড়ে দিলেন। ভুলত্রুটিগুলো শোধরাতে শুরু করলেন। জমকালো পোশাক পরা ছেড়ে দিলেন। শুধু বহির্জগৎ নয়, তাঁর অন্তর্জগতেও এল বিরাট পরিবর্তন। বিষয়-আশয়ের প্রতি তিনি নিরাসক্ত হয়ে উঠলেন। তাঁর মনে এল একধরনের উদাসীনতা। একধরনের বৈরাগ্য। সাধারণ মানুষের খোঁজখবর নেওয়া হয়ে উঠল তাঁর প্রতিদিনের কাজ। আর সব কাজের ওপর ছিল গান রচনা। তিনি আল্লাহর প্রেমে মগ্ন হলেন। তাঁর সব ধ্যানধারণা গান হয়ে প্রকাশ পেতে লাগল। সেই গানে তিনি সুরারোপ করতেন এভাবে:
লোকে বলে বলে রে,
ঘর বাড়ি ভালা নায় আমার
কি ঘর বানাইমু আমি, শূন্যের-ই মাঝার
ভালা করি ঘর বানাইয়া, কয় দিন থাকমু আর
আয়না দিয়া চাইয়া দেখি, পাকনা চুল আমার।
এভাবে প্রকাশ পেতে লাগল তাঁর বৈরাগ্যভাব। হাসন রাজা সম্পূর্ণ বদলে গেলেন। জীব হত্যা ছেড়ে দিলেন। কেবল মানবসেবা নয়, জীবসেবাতেও তিনি নিজেকে নিয়োজিত করলেন। ডাকসাইটে রাজা এককালে ‘চণ্ড হাসন’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু এবার তিনি হলেন ‘নম্র হাসন’। তাঁর এক গানে আক্ষেপের হাহাকার ধ্বনিত হয়েছে:
ও যৌবন ঘুমেরই স্বপন
সাধন বিনে নারীর সনে হারাইলাম মূলধন।
পরিণত বয়সে তিনি বিষয়-সম্পত্তি বিলিবণ্টন করে দরবেশ-জীবন যাপন করেন। তাঁর উদ্যোগে হাসন এম ই হাইস্কুল, অনেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও আখড়া স্থাপিত হয়।
সংগীতসাধনা
হাসন রাজার চিন্তাভাবনার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর গানে। তিনি কত গান রচনা করেছেন তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। হাছন উদাস গ্রন্থে তাঁর ২০৬টি গান সংকলিত হয়েছে। এর বাইরে আর কিছু গান ‘হাসন রাজার তিনপুরুষ’, ‘আল ইসলাহ্’সহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। শোনা যায়, হাসন রাজার উত্তরপুরুষের কাছে তাঁর গানের পাণ্ডুলিপি মরমি গানের ছকবাঁধা বিষয়ধারাকে অনুসরণ করেই হাসনের গান রচিত। ঈশ্বরানুরক্তি, জগৎ জীবনের অনিত্যতা ও প্রমোদমত্ত মানুষের সাধন-ভজনে অক্ষমতার খেদোক্তিই তাঁর গানে প্রধানত প্রতিফলিত হয়েছে। কোথাও নিজেকে দীনহীন বিবেচনা করেছেন, আবার তিনি যে অদৃশ্য নিয়ন্ত্রকের হাতে বাঁধা ঘুড়ি সে কথাও ব্যক্ত হয়েছে:
গুড্ডি উড়াইল মোরে, মৌলার হাতের ডুরি।
হাসন রাজারে যেমনে ফিরায়, তেমনে দিয়া ফিরি।।
মৌলার হাতে আছে ডুরি, আমি তাতে বান্ধা।
যেমনে ফিরায়, তেমনি ফিরি, এমনি ডুরির ফান্ধা।।
এই যে ‘মৌলা’ তিনিই আবার হাসন রাজার বন্ধু। স্পর্শের অনুভবের যোগ্য কেবল, তাঁর সাক্ষাৎ মেলে শুধুমাত্র তৃতীয় নয়নে:
আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে, আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে।
আরে দিলের চক্ষে চাহিয়া দেখ বন্ধুয়ার স্বরূপ রে।।
কিন্তু এই বন্ধুর সনে হাসন রাজার প্রেমের আশা বাঁধা পেত স্বজন ও সংসার। হাসনের খেদ:
স্ত্রী হইল পায়েরে বেড়ি পুত্র হইল খিল।
কেমনে করিবে হাসন বন্ধের সনে মিল।।
এদিকে নশ্বর জীবনের সীমাবদ্ধ আয়ু শেষ হয়ে আসে—তবু ‘মরণ কথা স্মরণ হইল না, হাসন রাজা তোর’। পার্থিব সম্পদ, আকাঙ্ক্ষা আর সম্ভোগের মোহ হাসন রাজাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আবার নিজেই নিজের ভুল বুঝতে পারেন:
যমের দূতে আসিয়া তোমার হাতে দিবে দড়ি।
টানিয়া টানিয়া লইয়া যাবে যমেরও পুরিরে।।
সে সময় কোথায় রইব (তোমার) সুন্দর সুন্দর স্ত্রী।
কোথায় রইব রামপাশা কোথায় লক্ষণ ছিরি রে।।
করবায় নিরে হাসন রাজা রামপাশায় জমিদারি।
করবায় নিরে কাপনা নদীর তীরে ঘুরাঘুরি রে।।
(আর) যাইবায় নিরে হাসন রাজা রাজাগঞ্জ দিয়া।
করবায় নিরে হাসন রাজা দেশে দেশে বিয়া রে।।
ছাড় ছাড় হাসন রাজা এ ভবের আশা।
প্রাণ বন্ধের চরণ তলে কর গিয়া বাসা রে।।
এই আত্মবিশ্লেষণ ও আত্মোপলব্ধির ভেতর দিয়েই হাসন রাজা মরমি-সাধন-লোকের সন্ধান পেয়েছিলেন।
মরমিসাধনার বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে জাতধর্ম আর ভেদবুদ্ধির ওপরে ওঠা। সব ধর্মের নির্যাস, সব সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যই আধ্যাত্ম-উপলব্ধির ভেতর দিয়ে সাধক আপন করে নেন। তাঁর অনুভবে ধর্মের এক অভিন্ন রূপ ধরা পড়ে—সম্প্রদায় ধর্মের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে সর্বমানবিক ধর্মীয় চেতনার এক লোকায়ত ঐক্যসূত্র রচনা করে। হাসন রাজার সংগীত, সাধনা ও দর্শনে এই 3
চেতনার প্রতিফলন আছে। হিন্দু ও মুসলিম ঐতিহ্যেও যুগল পরিচয় তাঁর গানে পাওয়া যায়। অবশ্য মনে রাখা প্রয়োজন, কয়েক পুরুষ পূর্বে হিন্দু ঐতিহ্যের ধারা হাসন রাজার রক্তে প্রবহমান ছিল। হাসন রাজার মরমিলোকে সাম্প্রদায়িক বিভেদের ঠাঁই ছিল না। তাই একদিকে ‘আল্লাজি’র ইশকে কাতর হাসন অনায়াসেই ‘শ্রীহরি’ বা ‘কানাই’—এর বন্দনা গাইতে পারেন।
একদিকে হাসন বলেন:
আমি যাইমুরে যাইমু, আল্লার সঙ্গে,
হাসন রাজায় আল্লা বিনে কিছু নাহি মাঙ্গে।
আবার পাশাপাশি তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়:
আমার হৃদয়েতে শ্রীহরি,
আমি কি তোর যমকে ভয় করি।
শত যমকে তে দিব, সহায় শিবশঙ্করী।।
হাসনের হৃদয় কান্নায় আপ্লুত হয়,
‘কি হইব মোর হাসরের দিন রে ভাই মমিন’,— আবার পাশাপাশি তাঁর ব্যাকুল আকাক্ষ্মা প্রকাশিত হয় এভাবে,—‘আমি মরিয়া যদি পাই শ্যামেররাঙ্গা চরণ’ কিংবা ‘দয়াল কানাই, দয়াল কানাই রে, পার করিয়া দেও কাঙ্গালিরে’। আবার তিনি বলেন, ‘হিন্দুয়ে বলে তোমায় রাধা, আমি বলি খোদা’। স্পষ্টই হাসনের সাধনা ও সংগীতে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের পুরাণ ও ঐতিহ্যের সমন্বয় ঘটেছে। এ বিষয়ে তিনি ছিলেন লালন ও অন্যান্য মরমিসাধকের সমানধর্মা।
হাসন রাজা কোন পন্থার সাধক ছিলেন তা স্পষ্ট জানা যায় না। তাঁর পদাবলিতে কোনো গুরুর নামোল্লেখ নেই। কেউ কেউ বলেন তিনি চিশতিয়া তরিকার সাধক ছিলেন। সুফিতত্ত্বের প্রেরণা ও প্রভাব তাঁর সংগীতে ও দর্শনে থাকলেও, তিনি পুরোপুরি এই মতের সাধক হয়তো ছিলেন না। নিজেকে তিনি ‘বাউলা’ বা ‘বাউল’ বলে কখনো কখনো উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি বাউলদের সমগোত্রীয় হলেও নিজে আনুষ্ঠানিক বাউল ছিলেন না। সুফিমতের সঙ্গে দেশীয় লোকায়ত মরমিধারা ও নিজস্ব চিন্তা-দর্শনের সমন্বয়ে তাঁর সাধনার পথ নির্মিত হয় বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। তাঁর সংগীতরচনার পশ্চাতে একটি সাধন-দর্শনের প্রভাব বলা যায়।
হাসনের গানে আঞ্চলিক শব্দ:
হাসন রাজার গানে আঞ্চলিক বুলি, প্রবচন ও বাগ্ধারার ব্যবহার লক্ষ করা যায়। হাসনের কিছু গান ও তার প্রকাশভঙ্গি গ্রাম্যতামুক্ত নয়। সুরুচি ও শ্লীলতার গণ্ডি অতিক্রম করে যায়। উদাহরণ:
স্বামীর সেবা না করিলে, ধরাইব নি লাঙ্গে।।
লাঙ্গের সঙ্গে মন মজাইয়া হারাইলায় নিজ পতি।।
বুড়ি বড় হারামজাদা, ডাকে মোরে দাদা দাদা।।
হাসন রাজায় যায় তোদের মুখেতে হাগিয়া।।
মুতিয়া দে তোর বাপের মুখে, তার মুখে দে ছাই।।
হাসন রাজার কোনো কোনো গানে স্থান-কাল-পাত্রের পরিচয় চিহ্নিত আছে। লক্ষণছিরি ও রামপাশা তাঁর জন্মগ্রাম ও জমিদারি এলাকার উল্লেখ বারবার এসেছে। পাওয়া যায় সুরমা ও আঞ্চলিক নদী কাপনার নাম। কোনো কোনো গানে প্রসঙ্গ হিসেবে নিজেই উপস্থাপিত হয়েছেন।
হাসন রাজা মুখে মুখে গান রচনা করতেন, আর তাঁর সহচরেরা কী নায়েব-গোমস্তা সেসব লিখে রাখতেন। তাঁর স্বভাবকবিত্ব এসব গানে জন্ম নিত, পরিমার্জনের সুযোগ খুব একটা মিলত না। তাই কখনো কখনো তাঁর গানে অসংলগ্নতা, গ্রাম্যতা, ছন্দপতন ও শব্দপ্রয়োগে অসতর্কতা লক্ষ করা যায়। অবশ্য এই ত্রুটি সত্ত্বেও হাসন রাজার গানে অনেক উজ্জ্বল পঙ্ক্তি, মনোহর উপমা—চিত্রকল্পের সাক্ষাৎ মেলে। তাঁর কিছু গান, বিশেষ করে ‘লোকে বলে, বলেরে, ঘরবাড়ি ভালা নাই আমার’, ‘মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়ারে’, ‘আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপরে’, ‘সোনা বন্ধে আমারে দেওয়ানা বানাইল’, ‘মরণ কথা স্মরণ হইল না হাসন রাজা তোর’, ‘আমি যাইমুরে যাইমু আল্লার সঙ্গে’, ‘কানাই তুমি খেইল খেলাও কেনে’, ‘একদিন তোর হইব রে মরণ রে হাসন রাজা’- সমাদৃত ও লোকপ্রিয় শুধু নয়, সংগীত-সাহিত্যের মর্যাদাও লাভ করেছে।
রবীন্দ্রনাথের চোখে হাসন রাজা:

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯ ডিসেম্বর ১৯২৫ Indian Philosophical Congress-এর প্রথম অধিবেশনে সভাপতি নির্বাচিত হন। সভাপতির অভিভাষণে তিনি প্রসঙ্গক্রমে হাসন রাজার দুটি গানের অংশবিশেষ উদ্ধৃত করে তাঁর দর্শনচিন্তার পরিচয় দেন।
ভাষণটি Modern Review (January 1926) পত্রিকায়Ô‘The philosophy of Our People’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। এর অনুবাদ প্রকাশিত হয় প্রবাসী (মাঘ ১৩২২) পত্রিকায়। ভাষণে হাসন রাজা সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক অংশ এখানে উদ্ধৃত হলো:
পূর্ববঙ্গের এক গ্রাম্য কবির [হাসন রাজা] গানে দর্শনের একটি বড় তত্ত্ব পাই সেটি এই যে, ব্যক্তিস্বরূপের সহিত সম্বন্ধ সূত্রেই বিশ্ব সত্য।
তিনি গাহিলেন,
মম আঁখি হইতে পয়দা আসমান জমিন
শরীরে করিল পয়দা শক্ত আর নরম
আর পয়দা করিয়াছে ঠান্ডা আর গরম
নাকে পয়দা করিয়াছে খুসবয় বদবয়।
এই সাধক কবি দেখিতেছেন যে, শাশ্বত পুরুষ তাঁহারই ভিতর হইতে বাহির হইয়া তাঁহার নয়নপথে আবির্ভূত হইলেন। বৈদিক ঋষি এমনইভাবে বলিয়াছেন যে, যে পুরুষ তাঁহার মধ্যে তিনিই আধিত্যমণ্ডলে অধিষ্ঠিত।
রূপ দেখিলাম রে নয়নে, আপনার রূপ দেখিলাম রে।
আমার মাঝত বাহির হইয়া দেখা দিল আমারে।।