কিংবদন্তি মুষ্টিযোদ্ধা মুহাম্মদ আলী- আহমদ আল মনজুর

91

 

জকিগঞ্জ ভিউঃ “‘ইসলাম এবং বক্সিং’ এ দুটোর মধ্য থেকে কোনো একটিকে বেছে নিতে বলা হয়; তবে আমি ইসলামকেই বেছে নেবো”

“আমাকে আমেরিকা থেকে কখনো বিতাড়িত করা হলে ভয় নেই; একটি দেশ (বাংলাদেশ) আমি পেয়েছি”।

(বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেয়ে মুহাম্মদ আলীর উক্তি, তারিখ: ১৮ ই ফেব্রুয়ারি ১৯৭৮ সাল) (বাংলাদেশ সফরকালের ভিডিওটি পোষ্টের সাথে সংযুক্ত আছে।)

বাংলাদেশ সফরকালে মুহাম্মদ আলী সুন্দরবন, সিলেট, রাঙামাটি ও কক্সবাজার ভ্রমণ করেন। বাংলাদেশের সৌন্দর্য দেখে বিমোহিত হন আলী। উচ্ছ্বসিত হয়ে বাংলাদেশকে ‘বেহেশত’ আখ্যা দেন তিনি। বিশ্ববাসীর উদ্দেশে বলেন, ‘বেহেশতে যেতে চাইলে বাংলাদেশে ঘুরে আসুন’!

মুহাম্মদ আলী (Muhammad Ali) একটি নাম একটি ইতিহাস একটি জাগরণের নাম।

তাঁর জন্ম নাম হচ্ছে ক্যাসিয়াস মার্সেলাস ক্লে জুনিয়র (Cassius Marcellus Clay Jr.)

একজন মার্কিন পেশাদার মুষ্টিযোদ্ধা ছিলেন, সাধারণভাবে যাকে ক্রীড়ার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হেভিওয়েট হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। ক্রীড়াজীবনের শুরুর দিকে আলী রিংয়ের ভেতরে ও বাইরে একজন অনুপ্রেরণাদায়ক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেড তাঁকে শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড় ও বিবিসি তাঁকে শতাব্দীর সেরা ক্রীড়াব্যক্তিত্ব হিসেবে সম্মানিত করেছে।

তাঁকে দ্যা গ্রেটেস্ট, দ্যা পিপলস চ্যাম্পিয়ন,দ্যা লুইভিলা লিপ ডাকনামে ডাকা হত।

১৯৪২ সালের ১৭ জানুয়ারি আমেরিকার কেন্টাকি অন্তর্গত লুইভিলা তে মুহাম্মদ আলী জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ক্লে সিনিয়র সাইনবোর্ড এবং বিলবোর্ড রঙ করতেন এবং মা ওডিসা গ্র্যাডি ক্লে একজন গৃহিনী ছিলেন।

কর্মজীবন শুরু: ক্লে ১২ বছর বয়সে প্রশিক্ষণ শুরু করেন। লুইভিলার পুলিস অফিসার তথা বক্সিং প্রশিক্ষক জো মার্টিন আলীকে প্রথম বক্সিং শিখতে বলেন, যখন তিনি বারো বছরের আলীকে একজন সাইকেল চোরের সঙ্গে মারপিট করতে দেখেন। এর পরবর্তী চার বছর বক্সিং কাটম্যান চাক বোডাক তাঁকে প্রশিক্ষণ দেন।

ইসলাম গ্রহণ: কৃষ্ণাঙ্গ হওয়া ছোটবেলা থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের শ্বেতাঙ্গ মানুষের অবজ্ঞার শিকার হন। শ্বেতাঙ্গ মানুষের চেয়ারে তাদের বসতে দেয়া হতো না। এমন কি একজন বিশ্বসেরা বক্সার হওয়ার পরও তাকে শ্বেতাঙ্গদের হোটেলে খাবার দেয়া হয়নি। সবকিছু মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ ব্যবস্থা ও শ্বেতাঙ্গ মানুষের প্রতি অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন তিনি। এ থেকে মুক্তির একটা পথ খুঁজছিলেন। ১৯৬৪ সালে ‘নেশন অব ইসলাম’ নামের একটি সংগঠনের সঙ্গে পরিচিত হন। তারা আফ্রিকা ও আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করতো। তাদের সংস্পর্শে গিয়ে ইসলামকে বুঝতে শেখেন তিনি। ইসলাম শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে কোনো পার্থক্য ও ব্যবধান রাখে না বলে জানতে পারেন তিনি। এতে এক সময় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মোহাম্মদ আলী নাম ধারন করেন। ‘নেশন অব ইসলাম’ সংগঠনটির সঙ্গে ‘ইসলাম’ শব্দ থাকলেও তারা শুধু ইসলাম নিয়ে কাজ করতো না। তারা ইসলাম ও খ্রিস্টান ধর্মের মধ্যে সমন্বয় করে একটি নতুন মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিল। বিষয়টি পরে বুঝতে পারেন মোহাম্মদ আলী। এতে ১৯৭৫ সালে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সুন্নী মুসলিম হন। এরপরই তিনি নিজেকে প্রকৃত মুসলিম বলে পরিচিত করতে থাকেন। এক সময় তিনি বলেন, ‘আমাকে যদি বক্সিং ও ইসলাম- এই দুটোর মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নিতে বলা হয় তাহলে অবশ্যই আমি ইসলামকে বেছে নিবো’। ইসলাম গ্রহণের পর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পৃথিবীর মানুষের মধ্যে সাম্য ও ভেদাভেদ দূর করতে কাজ করে গেছেন তিনি। সর্বশেষ ২০০৫ সাল থেকে ইসলামের সুফিবাদের সংস্পর্শে আসেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সুফিবাদ চর্চা করেন মোহাম্মদ আলী। তাঁর মুর্শিদ হচ্ছেন নকশবন্দিয়া তরিকার বর্তামান মশহুর বুযুর্গ আল্লামা হিশাম খাব্বানী ( বায়াতের ভিডিওটেপ সংযুক্ত আছে)

আলীর ইসলাম ধর্ম গ্রহণকে পশ্চিমা মিডিয়া ভালো চোখে দেখেনি। তাকে এজন্য মিডিয়ার অনেক গঞ্জনাও সইতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মেমফিসের রোডস কলেজের ধর্ম শিক্ষা বিষয়ক প্রফেসর ইয়াসির কাদি তাঁর একটি লেখায় মার্কিন মুসলিমদের ওপর মুহাম্মদ আলীর প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। কাদি লিখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামের ইতিবাচক ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার পেছনে আলীর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সা:) এর নাম যুক্তরাষ্ট্র ও সারা বিশ্বের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন’। তিনি আলীর রাজনীতি সচেতনতা ও সত্যের প্রতি অবিচল আস্থারও প্রশংসা করেন।
তার দেখাদেখি তারই ছোট ভাই রুডলফও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন, নিজের নাম পাল্টে রাখেন ‘রহমান আলী’।

ভিয়েতনাম যুদ্ধে যেতে অস্বীকার : ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে আলী তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস ও ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার অংশগ্রহণের বিরোধিতার কারণে মার্কিন সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদান করতে অস্বীকৃত হন। এর কয়েকদিন পরে তাঁকে এই কারণে দোষী সাব্যস্ত করে তাঁর বক্সিং উপাধি কেঁড়ে নেওয়া হয়। তিনি তাঁর জীবনের সেরা সময়ে পরবর্তী চার বছর কোন ধরণের বক্সিং প্রতিযোগিয়ায় নামতে পারেননি। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে তাঁর আপীল সুপ্রিম কোর্টে পেশ হয়, যেখানে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ সরিয়ে নেওয়া হয়। যুদ্ধের বিরুদ্ধে আলীর বিবেকজনিত কার্যকলাপ তাঁকে সংস্কৃতি বিরোধী প্রজন্মের নিকট শ্রদ্ধার পাত্র করে তোলে। বক্সিং জগতে ফিরে এসে আলী ১৯৭৪ ও ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে আবার বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে নেন।

বাংলাদেশ সফর: ১৯৭৮ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি একটি বিদেশি সংস্থা ৫ দিনের সফরে তাকে ঢাকায় এনেছিল। সে সময় তার সফর সঙ্গী ছিলেন তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী ওই সময়ের বিখ্যাত মডেল ভেরোনিকা পরশে, মেয়ে লায়লা আলী, ভাই, বাবা ও মা। একবার কিংবদন্তি বক্সার মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে বাংলাদেশের হয়ে কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রথম পদকজয়ী বক্সার আবদুল হালিম একই রিংয়ে নেমেছিলেন। তবে সেদিন আবদুল হালিমকে নকআউট করেননি তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন মোহাম্মদ আলী। তিনি আরও ছোট কাউকে চেয়েছিলেন তার সাথে মজা করার জন্য,তখন বাংলাদেশের জুনিয়র বক্সিং চ্যাম্পিয়ন ১২ বছর বয়সী গিয়াস উদ্দিন তার সাথে বক্সিং খেলার সুযোগ পান।সেই সফরে বাংলাদেশ সরকার তাকে সম্মান সূচক নাগরিকত্ব প্রদান করে। পল্টনের বক্সিং স্টেডিয়ামকে তাঁর নামে নামকরণ করা হয়।

মুহাম্মদ আলীর ইন্তেকাল: ১৯৮০ সালে তিনি পারকিন্সন্স রোগে (parkinson’s disease) আক্রান্ত হন।অবসরের পরে তিনি তার জীবনকে মানবতার কল্যাণে উৎসর্গ করেছিলেন। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। ৩২ বছর পারকিনসন্স রোগে ভোগার পর ০৩ জুন, ২০১৬ তে ৭৪ বছর বয়সে মারা যান তিনি।

তাঁর জানাজার নামাজ পড়ান বিশিষ্ট সুফি ও গবেষক শায়েখ জায়েদ শাকির। জানাজায় উপস্থিত ছিলাম আমেরিকার বিখ্যাত ধর্মান্তরিত মুসলমান, বিশিষ্ট সুফি ও ইসলামিক চিন্তাবিদ শায়েখ হামজা ইউসুফ সহ অসংখ্য বিখ্যাত ব্যক্তি বর্গ।

লেখকঃ সভাপতি, বাংলাদেশ আনজুমানে তালামীযে ইসলামিয়া, জকিগঞ্জ উপজেলা শাখা।