৭ই মার্চের ভাষণঃ একটি রাজনীতির কাব্য

74

মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
ঐতিহাসিক মাস মার্চ। বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাস। এ মাসে রয়েছে জাতীয় পতাকা দিবস, পতাকা উত্তোলন দিবস, বঙ্গবন্ধুর জন্ম ও জাতীয় শিশু দিবস। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিবস দুটি হলো ৭ মার্চের ভাষণ ও স্বাধীনতা দিবস। কেবল বাংলাদেশ নয় বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের জন্যও এ মাসের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। মাসটি স্মরণীয় হয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বীপরাজ্য ভার্জিনিয়ার মানুষের কাছেও।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বাঙালি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভাষণ দেন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ভাষণটি বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রামের প্রেরণা, মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির নির্দেশনা। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার এ ভাষণটি যুক্ত হয়। এটি দেশবাসীর জন্য বিশাল অর্জন। প্রায় ১৯ মিনিটের কালজয়ী ভাষণে ছিল একহাজার একশত সাতটি শব্দ। প্রতি মিনিটে গড়ে ৬০টি শব্দ উচ্চারিত হয়েছিল। শুরুতে ছিল না কোন অযাচিত ভূমিকা। ছিল না কোন ভণিতা কিংবা শব্দের পুনরাবৃত্তি। প্রথমে ছিল অগাধ বিশ্বাস ও ভালোবাসার সম্বোধন, ভাইয়েরা আমার। শেষ বাক্যে ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রত্যক্ষ নির্দেশনা। এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।। ভাষণ শেষ করেছিলেন, ‘জয় বাংলা’ বলে। ভাষণটি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর অন্যতম।
১৭৭৫ সালের ২৩ মার্চ তৎকালীন ভার্জিনিয়ার শাসক পেট্রিক হেনরি ব্রিটিশ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার ডাক দেন। যুদ্ধের ডাক দেওয়ার আগে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি প্রশ্ন তুলেন, ‘জীবন কী এতই প্রিয় আর শান্তি কী এতই মধুর যে, শিকল আর দাসত্বের দামে তাকে কিনতে হবে?’ এ প্রশ্নের উত্তর দেন তার অমর বাণী দিয়ে ‘আমি জানি না অন্যরা কোন পথ বেছে নেবে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে বলবো, আমাকে স্বাধীনতা দাও, নয়তো মৃত্যু।’ বঙ্গবন্ধুও প্রশ্ন করেন, ‘কি অন্যায় করেছিলাম? কি পেলাম আমরা? কিসের আরটিসি? কার সঙ্গে বসব? যারা আমার মানুষের রক্ত নিয়েছে তাদের সঙ্গে বসব?’ তিনি নিজেই এসবের উত্তর দেন। যোগাযোগ বিদ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে এধরনের প্রশ্ন শ্রোতাকে ধরে রাখার অন্যতম মাধ্যম। ময়দানে উপস্থিত অনেকেই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তখন হাজার হাজার লোক উপস্থিত থাকলেও বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সময় ছিল পিনপতন নিরবতা। মাঝে মাঝে স্লোগান উঠেছিল; বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।
দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের শোষণ ও নিযার্তন থেকে মুক্তি আন্দোলনের নেতা ও পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নেলসন ম্যান্ডেলার বক্তব্যের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘স্বাধীনতা অর্জনের কোনো সহজ পথ নেই’। ভারতের আজাদ ফৌজ হিন্দের সর্বাধিনায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু উক্তি করেছিনে, তোমরা আমাকে রক্ত দাও; আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব। পক্ষান্তরে বঙ্গবন্ধু তিনি উচ্চারণ করেন, রক্ত যখন দিতে শিখেছি; রক্ত আরও দিব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ। অন্যায় ও বৈষম্য প্রতিরোধে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন শহরের জনসভায় মার্টিন লুথার কিং উক্তি করেন, ‘আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন এই জাতি জাগ্রত হবে এবং মানুষের এই বিশ্বাসের মূল্যায়ন করবে, সব মানুষ জন্মসূত্রে সমান।’ পক্ষান্তরে বঙ্গবন্ধু উক্তি করেন; ‘আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো। তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার বুকের উপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না।’ ভাষণের শেষ পর্যায়ের মুক্তি সংগ্রামে নির্দেশনা দিয়ে বলেন; ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলো, তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকবিল করতে হবে। ভাষণটির তুলনা চলে ষোড়শ মার্কিন রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিঙ্কনের গেটিসবার্গ, ভারতের মহাত্মাগান্ধীর কুইট ইন্ডিয়া, ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন বক্তৃতা কিংবা কৃষ্ণাঙ্গ নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার বক্তৃতার সাথে।
সাতই মার্চের ভাষণকে বলতে চাই একটি রাজনীতিক কবিতা। এ ভাষণের জন্য ১৯৭১ সালের ৫ মার্চ নিউজউইক ম্যাগাজিন বঙ্গবন্ধুকে ‘রাজনীতির কবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। কবি নির্মলেন্দু গুণ জার্মান ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম ডয়চে ভেলের সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘একটি অমর কবিতার সব গুণ আছে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে। এর মধ্যে রয়েছে কাব্য এবং কাব্যিক ঢং। কাব্যগুণ সম্পন্ন বলেই হাজার হাজার ছেলে-মেয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ মুখস্থ বলতে পারে। অন্য কোনো ভাষণ এভাবে স্কুল কলেজের হাজার হাজার ছেলেমেয়ে মুখস্থ বলতে পারে বলে আমার জানা নাই। কাব্যগুণসম্পন্ন বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।’ ভাষণটি আমাদের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে সংকল্পের মতো কাজ করেছিল। বাংলার সাতকোটি বাঙালিকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আজ অর্ধ শতাব্দী পরেও স্পিকারে ভাষণটি শুনলে দেশপ্রেমী নাগরিকের রক্ত টগমগ করে ওঠে। জ্বলে ওঠে চেতনার শিখা। এবার সকল প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাথীরা ভাষণটি পাঠ করবে। প্রতিযোগিতায় অংশ নিবে। শিশুদের হৃদয় বাঙালি জাতীয়তাবোধ ও দেশপ্রেম সৃষ্টিতে এর চেয়ে ফলদায়ক কোন পদ্ধতি হতে পারে না। সাত মার্চের ভাষণ বাঙালি হৃদয়ে থাকবে চির অম্লান। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে দেশবাসীর কানে বাজবে; ভাইয়েরা আমার। … জয় বাংলা।

লেখক: শিক্ষার্থী; শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট