লতিফিয়া জামে মসজিদ নিয়ে বিরোধের নেপথ্য কাহিনি

957

জকিগঞ্জ ভিউ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন:
গত ২৯ রামাদান তারাবীহের সময় জকিগঞ্জ পৌরসভার দুই নং ওয়ার্ডে অবস্থিত লতিফিয়া জামে মসজিদে দুই পক্ষের মধ্যে বিবাদের খবর পাওয়া যায়। জানা যায়, এ সময় মাওলান হুসাইন আহমদ তাপাদার ও তার সাথে মসজিদে আগত কয়েক জনের সাথে মসজিদের নিয়মিত মুসল্লীদের মধ্য থেকে কয়েক জনের হাতাহাতি হয়েছে। এতে চার জন আহত হয়েছেন। সেদিন আসলে কী ঘটেছিল, সে ঘটনার নেপথ্যে আর কী আছে, এসব নিয়ে আজকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।

আমাদের অনুসন্ধান মতে এ ঘটনার প্রথম সূত্রপাত ঘটে ২২ রমাদান দিবাগত রাত তারাবীহের নামাজের সময়। মাওলানা হুসাইন আহমদ তখন মসজিদে নামাজের জন্য সমবেত মুসল্লীদের সামনে মসজিদ কমিটির নিকট ইমামের বিরুদ্ধে আপত্তি তুলে তাৎক্ষণিক ইমামকে বিদায় করার জন্য এবং এতেকাফ থেকে বের করে দেওয়ার জোর দাবি জানান। পাশাপাশি তিনি বর্তমান ইমামের পিছনে নামাজ পড়বেন না বলেও বলেন। ফজরের আগেই ইমামকে মসজিদ থেকে বের করার দাবিও জানান। এসব বলে তিনি নামাজ না পড়েই মসজিদ থেকে বেরিয়ে যান।

তারাবীহের নামাজ শেষে কমিটির পক্ষ থেকে মাওলানা হুসাইনের সাথে দফায় দফায় যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কমিটির সাথে মিটিঙে বসতে অস্বীকৃতি জানান, যদিও তিনি নিজেও কমিটির একজন সহসভাপতি। এরপর জকিগঞ্জ সিনিয়র মাদ্রাসার শিক্ষক ও জকিগঞ্জ ভিউ সম্পাদক মাওলানা ফদলুর রহমানের মাধ্যমে তিনি কমিঠমটিকে জানান, ফজরের ওয়াক্ত থেকে এই ইমাম আর নামাজ পড়াতে পারবেন না। তবে কমিটির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সাময়িকভাবে ইমামের ইতিকাফের বিষয়টি তিনি মেনে নেন।

রামাদান মাসে কোন ধরনের ফিতনায় না জড়ানোর স্বার্থে কমিটির পক্ষ থেকে তার এক তরফা সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া হয়। কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, আপাতত বদলি ইমাম হিসাবে মাওলানা মাশুক আহমদ আইওরী মসজিদে নামাজ পড়াবেন, তাঁর অনুপস্থিতিতে মহল্লার অন্য গণ্যমান্য আলেমগণ নামাজ পড়াবেন, আর ঈদের পর এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। তখন মাওলানা হোসাইন আহমদও এ সিদ্ধান্ত মেনে নেন।

পরবর্তীতে গত শুক্রবারে মাওলানা হুসাইন বদলি ইমামের বিষয়েও বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা বলে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করার চেষ্টা করেন। এসব কারণে সেদিন মাগরিব ও ইশার নামাজের পর মুসল্লিদের সাথে তার উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়।

পরের দিন শনিবার কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক মাওলানা মাশুক আহমদ আইওরীর ইমামতি করার কথা ছিল। কিন্তু মাওলানা হুসাইন নিজে থেকে কমিটির সিদ্ধান্ত ছাড়াই আসর ও মাগরিবের নামাজে ইমামতি করেন। ইমামতি করার ক্ষেত্রে তাকে কেউ বাধা না দিলেও আসরের নামাজের পর তিনি জোরপূর্বক ইমাম সাহেবকে ইতিকাফ থেকে বের করে দিতে চাইলে তখন উপস্থিত মুসল্লিগণ তাকে বাধা দেন। মুসল্লিদের বাধায় ইমাম সাহেবকে ইতিকাফ থেকে বের করতে ব্যর্থ হয়ে তিনি ইমামের হুজরায় তালা দিয়ে চলে যান।

এ সকল ঘটনার ধারাবাহিকতায় এশা তথা তারাবীহের সময় মাওলানা হুসাইন এ মহল্লার মুসল্লী নন এমন সহযোগীদের নিয়ে এসে উপস্থিত হন। লতিফিয়া মসজিদে এশার নামাজের নির্ধারিত সময় রাত ০৮:১৫ হলেও তিনি ০৮:০৭ মিনিটেই জামাত শুরু করতে চান। তখন উপস্থিত মুসল্লিদের মধ্য থেকে অনেকে তাঁকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করার জন্য অনুরোধ করেন। তিনি সে অনুরোধ না রেখে প্রথমে ঝগড়া শুরু করেন। এ সময় মাওলানা হুসাইন ও তার সাথে থাকা বহিরাগতরা নিয়মিত মুসল্লীদের সাথে হাতাহাতি শুরু করেন।

তখন মাওলানা হুসাইন ও তার সহযোগীদের হাতে ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম, রেদওয়ান প্রমুখ গুরুতর আহত হয়েছেন। হাতাহাতিতে মাওলানা হুসাইনও কিছুটা আহত হয়েছেন। উল্লেখ্য আহত সকলেই এই মহল্লার সদস্য হলেও হামলায় অংশগ্রহণকারী মাওলানা হুসাইনের সহযোগীদের মধ্য থেকে কেউই মহল্লার সদস্য কিংবা নিয়মিত মুসল্লি নয় বলে মসজিদ কমিটির সূত্রে জানা গেছে।

এ সময় পার্শ্ববর্তী মহল্লা তথা হাইদ্রাবন্দ থেকে মাওলানা হুসাইনের আরো অনেক সহযোগী লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মসজিদ প্রাঙ্গণে সমবেত হতে শুরু করেন, পাশাপাশি আরো অনেক বহিরাগত মাওলানা হুসাইনের স্থায়ী নিবাস বারগাত্তা থেকে সিএনজিযোগে মসজিদ প্রাঙ্গণে এসে সমবেত হন।

মহল্লার স্থানীয় মুসল্লিরা তখন কোন মতে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করার চেষ্টা শুরু করেন। আহতদের মধ্যে ব্যবসায়ী নজরুল ইসলামের অবস্থা গুরুতর হওয়াতে তাকে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। অন্যরা জকিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করেন।

এ দিকে মাওলানা হুসাইন তার সহযোগীদের নিয়ে তখনো মসজিদেই অবস্থান করছিলেন। পরে পুলিশ এসে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সকলকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দেয়। পরবর্তীতে রাতে তিনিও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে যান।

আহত নজরুল ও রেদওয়ান এখনো চিকিৎসাধীন থাকলেও মাওলানা হুসাইন ইতোমধ্যে উপজেলার ইছামতি মাদ্রাসা ঈদগাহে ঈদুল ফিতরের জামাতে ইমামতি করেছেন বলে জানা গেছে।

থানাসূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় উভয়পক্ষ পৃথক অভিযোগপত্র থানায় জমা দিয়েছেন। তবে অভিযুক্ত কাউকে এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি।
…..