আমি জানি না বলা জ্ঞানের অর্ধেক- মুহাম্মদ মাহমুদুল হাসান

15

জকিগঞ্জ ভিউঃ  ওয়ায মাহফিলে প্রশ্নোত্তর পর্বের পদ্ধতি কবে থেকে শুরু হলো জানি না, তবে এই পদ্ধতির কঠোর সমালোচকদের একজন আমি। কারণ এতে সমাজে অনেক ফিতনা দেখা দেয় আর বক্তারা অনেক সময় ইলমী খিয়ানত করে থাকেন। লোক-লজ্জার ভয়ে অজানা বিষয়েও উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেন যা খুবই গর্হিত। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে সকল বক্তা ওয়ায মাহফিলে সরাসরি প্রশ্নোত্তর দিয়ে থাকেন তাদের একজনকেও আজ পর্যন্ত কোন প্রশ্নের উত্তরে “আমার জানা নেই” বা “বিষয়টি আমি জানি না” এই কথা বলতে শুনি নি। ইহা খুবই ভয়ংকর মনে হয় আমার কাছে। বক্তারা নিজেকে বড় জ্ঞানী হিসাবে উপস্থাপন করতে গিয়ে অনেক অজানা বিষয় বা তাহকীক ছাড়া নিজের মতো করে উত্তর দিয়ে দেন। এর অনেক প্রমাণও রয়েছে।

ফতওয়া-মাসাইলের বিষয় তাহকীক ছাড়া উত্তর দিলে পরিণাম কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।আজ আলেমরা “জানি না” বলতে লজ্জাবোধ করেন, সে জন্য অজানা বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে সমাজে ফিতনা সৃষ্টি করেন। মাআযাল্লাহ।

সালফে সালেহীনের একটি আদর্শ ছিল তারা ফতওয়ার ক্ষেত্রে অধিক সতর্ক থাকতেন। মাসআলা মাসাইলের অধিকাংশ প্রশ্নের উত্তরে তারা বলতেন আমি জানিনা। ইমাম হাসান বসরী র. সম্পর্কে বর্ণিত আছে , কেউ যদি তাকে হালাল-হারাম সংক্রান্ত কোন মাসআলা জিজ্ঞেস করত তাহলে তার চেহারা লাল হয়ে যেত, চোখে মুখে এমন অবস্থা হতো যে, বুঝা যেত তিনি এসবের কিছুই জানেন না।
এই হলো আমাদের সালাফের অবস্থা। তারা ফতওয়া প্রদানের ক্ষেত্রে আল্লাহকে এত বেশি ভয় করতেন যা বর্তমান সময়ে আমরা কল্পনাও করতে পারব না। অথচ তাদের একেকজন ছিলেন ইলমে শরীআতের একেকটি সুবিশাল পাহাড়। ইলমের খনি হয়েও তারা ফতওয়া প্রদানের ক্ষেত্রে খুবই সতর্ক ছিলেন।
ইমাম মালিক র.; যার ইলমি গভীরতা আর পাণ্ডিত্যকে কেউই অস্বীকার করতে পারবেন না। তাকে ফতওয়া প্রদানের সতর্কতার জন্য উদাহরণ হিসাবেও পেশ করা হয়। তাকে যতো মাসআলা জিজ্ঞেস করা হতো তার অধিকাংশের উত্তরে তিনি বলতেন, আমি জানি না। এত বড় আলেম, একটি মাযহাবের ইমাম; তিনি জানি না বলতে লজ্জাবোধ করতেন না।
এক ব্যক্তি ইমাম মালিক এর ইলমী শান-শুহরত শুনে অনেক দূর থেকে তার কাছে এসে একটি মাসআলা জানতে চাইলো। ইমাম মালিক র. তাকে বললেন, এ মাসআলা আমার জানা নেই। লোকটি বললো, আমি অনেক দেশ পাড়ি দিয়ে আপনার কাছে এসেছি। তিনি বললেন- ঠিক আছে, দেশে ফিরে যাও। সেখানে গিয়ে লোকদের বলবে তুমি আমাকে এই মাসআলা জিজ্ঞেস করেছিলে আর আমি বলেছি, এটা আমার জানা নেই।

আমাদের সমাজের আলেমরা “আমি জানি না” কথা বলাকে লজ্জাজনক মনে করেন। অথচ আজানা বিষয়ে আমি জানি না বলাটাই ইলমের ক্ষেত্রে আমানতদারী। আর এটাই আমাদের পূর্বসূরীদের নিদর্শন। হযরত উমর ইবনু আব্দিল আযীয র. বলেন-
من قال لا أدري فقد احرز نصف العلم
-যে ব্যক্তি আমি জানি না বললো সে অর্ধেক ইলম আয়ত্ব করে নিল। এ জন্য ইমাম শাবী র. বলেন-
لا أدري نصف العلم
-আমি জানি না বলা হলো জ্ঞানের অর্ধেক।

ফিরিশতাদেরকে আল্লাহ তাআলা যখন বিভিন্ন বিষয়ের নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন তখন তারা উত্তরে বলেছিলেন لا علم لنا الا ما علمتنا
-(আল্লাহ) আপনি আমাদের যা শিখিয়েছেন তা ব্যতীত আমরা আর কিছুই জানি না।
এই আয়াতের তাফসীরে ইমাম কুরতুবী র. বলেন,
কাউকে যদি এমন কোন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় যা সে জানে না তাহলে তার জন্য আবশ্যক হলো সে বলবে, আল্লাহু আ’লাম, আমি এ বিষয়ে জানি না। আর এই কথা বলা নবীগণের আদর্শ, ফিরিশতাদের আদর্শ, আলেম বুযুর্গদের আদর্শ।…ইমাম মালিক র. বলেন, আলেমদের উচিত তাদের ছাত্রদের لا أدري (আমি জানি না) বলার অভ্যাস শিখিয়ে যাওয়া। যাতে পরবর্তীতে যখন তাদের এমন বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে যা সে জানে না তখন যেন বলতে পারে, আমি জানি না।
ইমাম শা’বী র. ইরাকের প্রসিদ্ধ ফকীহ ছিলেন। কিছু লোক তাকে একটি মাসআলা জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আমি জানি না। তখন তারা বললো, আপনি ইরাকের এত বড় মুফতী হযে বললেন জানি না, একটুও লজ্জা করে নি! তিনি বললেন, লজ্জা করবে কেন, ফিরিশতারা যখন আল্লাহকে বলেছিলেন আমরা জানি না তখন তো তারা লজ্জা পান নি।
এই হলো আমাদের সালাফদের অভ্যাস, তারা অজানা বিষয়ে আমি জানি না বলাকে কোন অপরাধ বা লজ্জা মনে করতেন না।

ইমাম শাতবী উল্লেখ করেন, ইমাম মালিক র. কে কোন ফতওয়া জিজ্ঞেস করা হলে তিনি দীর্ঘ সময় নিতেন, অনেক চিন্তা-ভাবনা করতেন, কখনো কখনো নিজে ফতওয়া না দিয়ে অন্য আলেমের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। আর নিজে ফতওয়া দেওয়ার সময় আল্লাহর ভয়ে তার চোখ থেকে পানি ঝরত।
আজকে ফতওয়া দেওয়ার অবস্থা কেমন? ইলম, আমল ছাড়া শুধু লোকদের প্রশংসা পাওয়ার জন্য ইচ্ছেমতো ফতওয়া দিচ্ছেন। সবজান্তার মতো জানা-অজানা সব বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করেন। পরিণামে সমাজ, জাতি কী পাচ্ছে তা সকলের সামনে পরিষ্কার।
———————————

তথ্যঃ
১. তাফসীরে কুরতুবী
২. তাবকাতুশ শাফিঈয়া
৩. জামিউল হিকাম
৪. আল-মাওয়াকিফাত লিশ শাতাবী