আল্লামা মুফতি মুজাহিদ উদ্দিন দুবাগী (র.) ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এক অনন্য ব্যক্তিত্ব

54

জকিগঞ্জ ভিউঃ  আল্লাহপাক যুগে যুগে এমন কতেক মানুষকে এ পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন যারা পথ হারা আল্লাহবিমুখ মানুষকে তাদের মেধা-পরিশ্রম দ্বারা আল্লাহমুখি করেছেন। এসব মানুষের সারাটি জীবন ব্যয় হয়েছে আল্লাহপাকের হুকুম-আহকাম প্রচার করে। কেউ বয়ানের মাধ্যমে কেউ বা লেখালেখির দ্বারা। ঠিক এমন এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামি চিন্তাবিদ, বহুগ্রন্থ প্রণেতা, পীরে কামিল, শায়খুল হাদীস আল্লামা মুফতি মোঃ মুজাহিদ উদ্দিন চৌধুরী দুবাগী সাহেব কিবলাহ রাহিমাহুল্লাহ। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ইলম ও আমলে, লেখা-লেখিতে, বাক-বক্তৃতায় পারদর্শী এক সু-পুরুষ। ইলমে তরিকতে তিনি ছিলেন আমাদের পীর-মুর্শিদ শামসুল উলামা আল্লামা ফুলতলী সাহেব কিবলাহ রাহিমাহুল্লাহ এর অন্যতম খলিফা। এখানে একটি কথা বলে রাখি, আল্লামা ফুলতলী সাহেব কিবলাহ রাহিমাহুল্লাহ যে কাউকে তরিকতের খেলাফতের ইযাজত প্রদান করেন নি। আপনারা লক্ষ্য করলে দেখবেন, তিনি যাদেরকে ইযাজত দিয়েছেন তাঁরা বহু প্রতিভার অধিকারী, ইলমে দ্বীনে পারদর্শী দুনিয়াবিমুখ আল্লাহওয়ালা ব্যক্তিত্ব ছিলেন। এখানে ইমাম মালিক (রঃ) এর একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন “যে ব্যক্তি ফিকহ শিক্ষা ছাড়া তাসাউফ অর্জন করে সে জিন্দিক বা অবিশ্বাসী। আর যে ব্যক্তি তাসাউফ ছাড়া ফিকহ অর্জন করল, সে ফাসিক তথা সত্যত্যাগী। আর যে ফিকহ ও তাসাউফ উভয় প্রকার ইলম শিখল, সে মুহাক্কিক তথা প্রকৃত ইলম শিখল”। আল্লামা দুবাগী রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন এই শ্রেণির একজন মুহাক্কিক তথা প্রকৃত ইলম ওয়ালা মহান ব্যক্তি। এক কথায়, আল্লামা দুবাগী সাহেব ছিলেন একাধারে পীরে তরিকত ও রাহবারে শরীয়ত।

আল্লাহ’র ওলি আল্লামা দুবাগী রাহিমাহুল্লাহ জনসেবামূলক একাধিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত করে এর সাথে জড়িত থেকে “খেদমতে খলক” বা আল্লাহ’র সৃষ্টির সেবা করে গেছেন। যেমনঃ ইউকের জনগণকে নিয়ে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। যার নাম রাখেন “আঞ্জুমানে আল ইসলাহ ইউকে”। তিনি সর্ব প্রথম ১৯৮০ সালে “আঞ্জুমানে আল ইসলাহ ইউকে ” সংগঠনের বুনিয়াদ স্থাপন করেন এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আক্বিদা বিশ্বাসী মুসলিম জনগণকে নিয়ে কুরআন সুন্নাহ তথা দ্বীন ইসলামের কাজ বৃটেনের জমিনে চালিয়ে যেতে থাকেন। যার প্রতি পূর্ণ সমর্থন ইজাজত ও দোয়া ছিল তাঁর পীর- মুর্শিদ ওলীয়ে কামিল শামসুল উলামা হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ রাহিমাহুল্লাহ’র।
এছাড়াও ১৯৭৮ সালে লন্ডনে দারুল হাদিস লতিফিয়া প্রতিষ্ঠা করতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। কারী সোসাইটি প্রতিষ্ঠায় তিনি বিশেষ অবদান রাখেন। ইউকে উলামা সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। তাছাড়া আরও অসংখ্য দ্বীনি খেদমতে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

আল্লামা দুবাগী রাহিমাহুল্লাহ এর যে, সিলেট অঞ্চলে তাঁর বিচরণ ছিল শুধু তা নয়, বরং বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং ভারত, পাকিস্তান ও ইংল্যান্ডে তাঁর অনেক ভক্ত-মুরীদান রয়েছেন। যারা তাঁকে অনুসরণ করে এখনো সুন্নতে নববীর উপর অটল ও মজবুত আছেন। তিনি ইলমি ও আমলের বিষয় যা বলতেন তারা তা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে আমল করত। বিশেষ করে তিনি ইংল্যান্ডে শামছুল উলামা আল্লামা ফুলতলী সাহেব কিবলাহ রাহিমাহুল্লাহ’র পক্ষ থেকে একজন সু-যোগ্য প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। এমনকি দেশে থাকাবস্থায় বিভিন্ন মাদরাসায় ইলমে তাফসীর, ইলমে হাদীস, ও ইলমে ফিকহ বিষয়ে অধ্যাপনা করে এবং ওয়াজ, নসিহত মুনাযারায় (বির্তকে) অংশগ্রহণ করে সুন্নীয়তের পক্ষে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।

আল্লামা দুবাগী রাহিমাহুল্লাহ’র ইলমি পাণ্ডিত্য মুগ্ধ হয়ে বিশ্ববরেণ্য ইসলামি স্কলারগণ ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। যেমন বর্তমান সময়ের শায়খুল ইসলাম বহুগ্রন্থ প্রণেতা মিনহাজুল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল এর প্রতিষ্ঠিতা ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক ড. তাহির আল কাদরী হাফিযাহুল্লাহ তাঁকে মুফতিউল আসর (যুগের মুফতি) হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। ঠিক তেমনি উস্তাযুল উলামা ওয়াল মুহাদ্দিসীন আল্লামা হাকীম আব্দুল খালিক মুজাদ্দিদী সাহেব আল্লামা দুবাগী রাহিমাহুল্লাহকে ফখরে বাংলাদেশ (বাংলার গৌরব) উপাধিতে ভূষিত করেছেন।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী আল্লামা দুবাগী রাহিমাহুল্লাহ একদিকে ছিলেন ইলমে হাদিসে সু-পারদর্শী একজন শায়খুল হাদীস, ইলমে ফিকহে সুপণ্ডিত মুফতিয়ে আযম। তাকওয়া পরস্তিতে বে-মিছাল অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। অন্যদিকে ছিলেন সফল ও যুগ শ্রেষ্ঠ লেখক-গবেষক। যার প্রমাণ হল তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ মীলাদে বেনজীর। মীলাদে বেনজীর গ্রন্থটি মুতাআ’লা করলে দেখা যায় যার মধ্যে তিনি পূর্ববর্তী সালাফদের মীলাদ সম্পর্কিত যত দলীল ও তথ্য-উপাত্ত রয়েছে তিনি তা সংগ্রহ করে উক্ত গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেন। এখানে একটি কথা বলি, তাঁর উক্ত গ্রন্থটি পাঠ করে আমাদের বিয়ানীবাজার কামিল মাদ্রাসার সাবেক সহকারী অধ্যাপক বর্তমান লন্ডন প্রবাসী মাওলানা হেলাল উদ্দিন খান সাহেব মীলাদমুখি হয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমি আল্লামা দুবাগী সাহেব রাহিমাহুল্লাহ’র মীলাদে বেনজীর গ্রন্থটি পাঠ করে গ্রন্থটির দলিল গুলো যাচাই-বাছাই করে দেখলাম এগুলোর মধ্যে কোন ভূল তথ্য নেই। আল্লামা দুবাগী সাহেব যা লিখেছেন তা সত্য ও সঠিক। তাই এখন আমি মীলাদ পড়ি এবং লোকদের মীলাদ পড়তে বলি।

আমার জানা মতে, সর্বপ্রথম তিনি যে কিতাব রচনা করেছিলেন এর নাম হল মানাছুল মুফতি তথা মুফতিগনের দলিল। আমি যখন দাখিল পঞ্চম শ্রেণি (বর্তমানে দাখিল নবম শ্রেণি) অধ্যয়ণরত ছিলাম তখন সেগ্রন্থটি সংগ্রহ করি। পরবর্তীতে তা মুতাআ’লা করে দেখিছি, মুফতিগণ কোন কোন বিধির বলে এবং কোন কোন উসুলের মাধ্যমে ফতোয়া প্রদান করবেন সেসব বিধি ও উসুল সম্পর্কে উক্ত গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। মানাছুল মুফতি কলরবে ছোট হলেও তা প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন মুফতি আল্লামা সায়্যিদ আমিমুল ইহসান রাহিমাহুল্লাহ’র রচিত কাওয়াইদুল ফিকহের মত একটি গ্রন্থ।
আল্লামা দুবাগী রাহিমাহুল্লাহ আল মাসাইলুল নাদীরা নামে একটি কিতাব লিখেছেন। এ কিতাবটির বাংলা আংশিক অনুবাদ করা আমি অধমের সৌভাগ্য হয়েছিল। কিতাবটি তাঁর হস্তে লিখিত গ্রন্থ আকারে বহু বড়। তাঁর হাতের আরবি, উর্দু, ফার্সী, ইংরেজি, বাংলা লেখা ছিল অত্যন্ত সুন্দর ও পরিপাটি।
আল্লামা দুবাগী সাহেবের শবেকদরের তাৎপর্য নামক একটি কিতাব রয়েছে। যার অনুবাদ আমি অধম করেছি। দুবাগী সাহেবকে বলা হয়েছিল শবেকদর বিষয়ে কিছু লিখে দেওয়ার জন্য। তখন তিনি কয়েকটি পাতা উর্দু ভাষায় তাঁর সুন্দর হস্তে লিখে আমার কাছে পাঠান। আমি অনুবাদ ও সম্পাদনা করলে তা পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়।
তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কিতাব হল- শবেবরাত, বিবিধ মাসাইল, অতিম প্রসঙ্গে, ফাতেহা ও কবর যিয়ারতের মাসাইল, পূণ্যের দিশারি, ফতোয়ায়ে মোজাহিদিয়া, এক নজরে হজ্জ ও যিয়ারত, কদমবুছির তথ্য, দোয়ার মাহাত্ম্য প্রভৃতি।
আমি সংক্ষিপ্ত আকারে যে কয়েকটির কিতাবের বিবরণ উপরে উল্লেখ করেছি তাতে প্রতীয়মাণ হয় যে, আল্লামা দুবাগী সাহেব রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন এ-যুগের শ্রেষ্ঠ লেখক ও গবেষক। তাঁর এসব কালজয়ী গ্রন্থ মুতাআ’লা করে আমার মত অনেক তালিবে ইলম উপকৃত হয়েছেন এবং বর্তমানেও হচ্ছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-‘যখন মানুষ মারা যায়, তিনটি কাজ ছাড়া মানুষের আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। প্রথমটি হলো অর্জিত ধন-সম্পদ থেকে সাদকা করা, যে দানের সাওয়াব অবিরাম দানকারী মৃতবক্তির আমল নামায় পৌঁছবে।
দ্বিতীয়টি হলো এমন জ্ঞান অর্জন করা; যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হবে। আর তৃতীয়টি হলো এমন নেক সন্তান রেখে যাওয়া; যে সন্তান মৃত্যুর পর মৃতব্যক্তির জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবে। (মুসলিম)

দেশ-বিদেশে আল্লামা দুবাগী সাহেব রাহিমাহুল্লাহ এর অনেক ছাত্র রয়েছেন। যারা নিজ নিজ পরিমন্ডলে ইলমে দ্বীনের খেদমত করে যাচ্ছেন।

আমি বিশ্বাস করি আল্লামা দুবাগী সাহেব রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি যার রেখে যাওয়া জ্ঞান-ভান্ডার থেকে আমরা এবং দেশ-জাতি উপকৃত হতে পারব। বিশেষ করে বিশ্বের ইলম চর্চাকারী ব্যক্তিবর্গ উপকৃত হবে।

আমি এ মনীষিকে ১৯৯৩ সালে তিনি যখন বাংলাদেশে আসেন তখন তাঁকে ক্ষনিকের জন্য দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। কিন্তু তাঁর গবেষণাধর্মী লেখনির মাধ্যমে মরহুমের ইলমি মাকাম জানার সুযোগ হয়। বিশেষ করে তাঁর সাহেবজাদা জনাব মাওলানা জিল্লুর রহমান চৌধুরী এবং জনাব মাওলানা ওলিউর রহমান চৌধুরী সাথে ছাত্রজীবন থেকে অনেক জানা-শোনা এবং ভালো সম্পর্ক ছিল। তাঁদের মাধ্যমে আমি দুবাগী সাহেবের প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ ও পান্ডুলিপিগুলো দেখার সুযোগ হয়েছে। বিশেষ করে দুবাগী সাহেব বিভিন্ন বিষয় ও মাসয়ালার উপর যে ফতোয়াগুলো প্রকাশ করতেন তা আমার হস্তগত হত। দুবাগী সাহেবের কর্মবহুল জীবনির উপর অনেক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে আমি মনে করি।

একজন আলেমের মৃত্যু মানে একটি জাহানের মৃত্যু। দুবাগী সাহেবের ইন্তেকালে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা কখনো পূরণ হওয়ার নয়। আল্লাহ যেন তাঁর বহুমুখী খেদমতসমূহ কবুল করেন এবং তাঁকে যেন জান্নাতুল ফেরদৌসের উচ্চ মাকাম দান করেন। তাঁর সন্তান-সন্ততিদেরকে সু্-যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে যেন কবুল করেন। আমিন
اللهم اکرم نزله ووسع مدخله وأبدله دارا خيرا من داره اهلا خيرا من اهله ونقه من الخطايا كما ينقي الثوب ألابيض منالدنس وبلغه الدرجات العلي من الجنة آمين_

লেখকঃ মাওলানা মোঃ আব্দুল আলীম

অধ্যক্ষ, মাথিউরা সিনিয়র ফাযিল মাদরাসা ও সিন্ডিকেট সদস্য, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।