কবি আল মাহমুদকে বিভক্ত করেন কেন? সারওয়ার চৌধুরী

13

জকিগঞ্জ ভিউঃ কবি আল মাহমুদকে কেউ ‘সোনালী কাবিন’-র কবি, কেউ ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’-র কবি বলে শান্তি পেতে দেখা যায়। যারা ‘সোনালী কাবিন’সহ প্রথম দিকের কয়েকটি কাব্যগ্রন্থের পক্ষ নিয়ে, এরপরে তাদের বিবেচনায় তিনি বরবাদ হয়ে গেছেন বলে আংশিক হেইট স্পিচ ঢালেন। কেন?

কবি আল মাহমুদকে যারা বিভক্ত করেন, আংশিক বিদ্বেষ ঢালেন তাঁর উপর, তারা একদিকে ব্যক্তির স্বাধীনভাবে কাজ করার (ফ্রিডম অব এ্যাকশন) পক্ষে কথা বলে থাকেন। কিন্তু কই? তারা কোথায় দাঁড়ালেন? কোথাও না। নিজেদের পছন্দ অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে সচেষ্ট। কেন? ইনডিভিডুয়েলিস্ট হন যদি, তাতেই থাকেন। অন্যকেও স্বাধীনভাবে তার পথে চলতে দেন। নাকি কেবল বকবক কোনো স্বার্থে?
তাদের আচরণে যে ধরনের বিরোধ প্রকাশ পায় তা হাস্যকর। তাদের বিহেভিওরাল ভেরিয়েন্স বেশ নজরকাড়া। দেখা যায়, তারা না থাকেন তাদের অহংবাদে (ইনডিভিডুয়েলিজম) না থাকেন সংহতিবাদে (কালেক্টিভিজম)।
কবি আল মাহমুদের ‘সমালোচনা’ করবার দোহাই দিয়ে থোড়া হেইট স্পিচ দেওয়ার ‘উপযুক্ত যুক্তি’ হিসাবে যারা এজরা পাউন্ড ও আর্নেস্ট হেমিংওয়ের আমল ও আচরণ সামনে আনেন, তারা কতটুকু কী আনেন? আধা আনেন আধা লুকান কেন? যদিও এজরা পাউণ্ডের ‘অপরাধের’ সাথে তুলনা করার মতো কোনো ‘অপরাধ’ আল মাহমুদ করেন নি। তবু তারা এটা বোঝাতে চান যে, ইন্টারন্যাশনাল প্রেক্ষাপটে এমন কিছু আছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার ও মুসোলিনির পক্ষ নিয়ে, মানে ফ্যাসিবাদের সমর্থনে কবি এজরা পাউন্ড লেখেন এবং রেডিওতেও জনমত বাড়াতে কথা বলতেন। এই কারণে আমেরিকা জোটের সেনারা পাউন্ডকে ধরে নিয়ে ২৫ দিন পশুর খাঁচায় রাখে প্রকাশ্যে। তার বন্ধু আর্নেস্ট হেমিংওয়ে পাউন্ডের শাস্তির দাবী করেছিলেন। পাউন্ডের উপর উপহাস বর্ষণের কথাও বলেছিলেন।
এগার বছর পাউন্ডকে আটকও রাখা হয়। পাগল উল্লেখ করে মানসিক হাসপাতালে রাখা হয়।
কিন্তু ইতিহাসের কথা এতটুকুতেই শেষ নয় হে পক্ষপাতদুষ্ট বন্ধু। হেমিংওয়ে শাস্তি চেয়েছেন আবার বিনা বিচারে পাউন্ডকে আটক রাখার প্রতিবাদও করেছেন তা উল্লেখ করেন না কেন? এতো বড় মাপের কবির প্রতি নিষ্ঠুর আচরণের ইতি চেয়েছিলেন হেমিংওয়ে। পাউন্ডের ৭০তম জন্মদিনে লিখেন, “কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাকে মুক্ত করে ইতালিতে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হোক, যেখানে তিনি কবি হিসাবে সম্মানিত হবেন”।

উল্লেখ্য, টি এস এলিয়ট, জেমস জয়েস, ডব্লিউ বি ইয়েটস, রবার্ট ফ্রস্ট, উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, ফর্ড মার্ডক্সসহ ঐ সময়ের আরো কয়েকজন বাঘা বাঘা সাহিত্যিককে মন খুলে সাহায্য করেছিলেন এজরা পাউন্ড। তাদের লেখা এডিট করেছেন, ছেপেছেন, অন্য ম্যাগাজিনগুলোর সম্পাদকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। কাউকে টাকা দিয়েছেন, কাউকে নিজের কাপড় পরতে দিয়েছিলেন। এলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-র যে-ভার্শনটি দুনিয়ায় মানুষের সামনে এসেছে, সেটির বেশিরভাগ এডিট এজরা পাউন্ড করেছিলেন।
দেখার বিষয় এই যে, ফ্যসিবাদের প্রতি একটা সময় লেগে থাকা সত্বেও, আদর্শের অন্ধতামুক্ত হয়ে পাউন্ডের বন্ধুরা, ইউরোপের সাহিত্য সংস্কৃতির বাঘা বাঘা গুণীজনেরা অবশেষে এজরা পাউন্ডের শিল্পকর্মের দাম দিয়েছে, সম্মানিত করেছে।
আল মাহমুদ অসাধারণ কবি ছিলেন। অসাধারণ কথাশিল্পী ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক পক্ষপাত আগে ও পরে যেদিকেই ছিল, সেটা তাঁর ব্যাপক শিল্পকর্মের সামনে নিতান্ত গৌণ — উপেক্ষনীয়। তাঁকে মুল্যায়ন করতে দেখতে হবে তাঁর প্রধান কাজ কী ছিল? তিনি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর কবিতা ‘চুল খোলা আয়েশা আক্তার’। খেয়াল করার বিষয় ‘চুল বান্ধা আয়েশা আক্তার’ না। তাঁর কবিতা ‘চরের পাখি’। ফ্যাসিবাদের গোয়ালের বান্ধা গরু না। ‘চুল খোলা আয়েশা আক্তার’ এর উচ্চতার সৌন্দর্য অতুলনীয়। এই সৌন্দর্য জাতীয়তাবাদের অন্ধতার ভিতরে থেকে অনুধাবন করা সম্ভব না। আর তাঁর ‘সোনালী কাবিন’ হৃদয়ে ধারণ করতে না পারলে, এটা ঠিক যে সোনালী কাবিনের কবিকে চিনতে পারবেন না। পারেন না বলেই আংশিক বিদ্বেষ জাহির করেন।
উল্লেখ করা যাক একটি দৃষ্টান্ত। বাউল শাহ আব্দুল করিম আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে ছিলেন। কিন্তু তাঁর গান-ভাবের রসের সামনে তাঁর দলীয় পক্ষপাতের বিষয়টি নিতান্ত গৌণ, আসেই না। তাঁর গানের সৌন্দর্য তাঁর দলীয় অবস্থানের সীমা ছাড়িয়ে বাংলার সব মানুষকে সহজেই স্পর্শ করে। শিল্প আর শিল্পীর মাহাত্ম্য এখানেই নয় কি? শিল্প রোদ জোছনা বৃষ্টির মতো সকলের হয়।
তারা আল মাহমুদের নৈতিক স্খলনের কথা বলেন। সারা বিশ্বে সমাদৃত কবি নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়র একজন ডাইহার্ড পূঁজিবাদী ছিলেন। টেক্স ফাঁকি দেয়ার জন্যে ভেলকি করতেন। ‘মার্চেন্ট অব ভেনিস’র এই অসাধারণ লেখক ব্যক্তিজীবনে একজন পাষাণ মনের ব্যবসায়ী ছিলেন। খাদ্য মজুদ করে রেখে নিদানকালে চড়া দামে বেচতেন। তাঁর মধ্যে সাম্প্রদায়িকতাও ছিল। তিনি খৃষ্ট ধর্মে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। মানে তুলনা করলে নৈতিক পতন বিশাল আকারের ছিল যুগস্রষ্টা কবি শেক্সপিয়রের চরিত্রে। এইসব কারণে কি শেক্সপিয়র বাতিল হয়েছেন? স্খলনের সহজ বাংলা হল ভুল, পতন। ইংরেজিতে ফল্, মিসটেক, এরর। বলেন তো কোন্ আদম সন্তানের ভুল নাই জিবনে? অনিচ্ছায়ও কি স্খলন হয় না? যেসব কাজ অন্যের বিবেচনায় নৈতিক স্খলন মনে করা হয়, তা আসলেই তেমন স্খলন কিনা?